গুগল ম্যাপেই দেখুন ঢাকাসহ ৩৪ জেলার বায়ুর মান

গুগল ম্যাপের ‘এয়ার কোয়ালিটি’ স্তরে ঢাকাসহ বাংলাদেশের ৩৪ জেলার বায়ুমান-সংক্রান্ত তথ্য দেখা যাচ্ছে।
গুগল ম্যাপে যুক্ত হয়েছে ঢাকাসহ ৩৪ জেলার বায়ুর মান দেখার সুবিধা। প্রতীকী ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি

এখন গুগল ম্যাপের মাধ্যমেই সরাসরি জানা যাচ্ছে বাংলাদেশের বায়ুদূষণ পরিস্থিতি। দেশের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) তথ্য ও কারিগরি সহায়তায় ঢাকাসহ ৩৪টি জেলার বায়ুমান-সংক্রান্ত তথ্য গুগল ম্যাপের ‘এয়ার কোয়ালিটি’ স্তরে যুক্ত হয়েছে।

‘নীল আকাশের জন্য আন্তর্জাতিক নির্মল বায়ু দিবস’ (International Day of Clean Air for blue skies) উপলক্ষে গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সবার জন্য এই সুবিধা আরও সহজলভ্য করা হয়। গুগল ম্যাপের ‘এয়ার কোয়ালিটি’ স্তর চালু করলে বিভিন্ন এলাকার বায়ুর মান রং ও সংখ্যার মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো স্থানের ওপর চাপ দিলে সেখানকার বায়ুমান সূচক বা একিউআই দেখা যায়।

নির্মল বায়ু দিবস কী?

প্রতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর ‘নীল আকাশের জন্য আন্তর্জাতিক নির্মল বায়ু দিবস’পালিত হয়। বায়ুদূষণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং নির্মল বায়ু নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরাই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৭ সেপ্টেম্বরকে এ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০২০ সালে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়।

যে ৩৪ জেলা যুক্ত হলো

বর্তমানে দেশের ৩৪ জেলায় ক্যাপসের লাইভ মনিটরিং স্টেশন চালু হয়েছে। সেগুলো হলো:

ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ: ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও টাঙ্গাইল।

উত্তরাঞ্চল (রংপুর ও রাজশাহী): নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, পাবনা।

দক্ষিণাঞ্চল (বরিশাল ও খুলনা): বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ: চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, ফেনী, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার।

দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে বর্তমানে ৩৪টি, অর্থাৎ প্রায় ৫৩ শতাংশ জেলা এই নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে। বাকি জেলাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে মনিটরিং স্টেশন স্থাপন করে পুরো দেশকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্মার্টফোনে বায়ুর মান দেখবেন যেভাবে

১. মোবাইল ফোনে Google Maps অ্যাপটি চালু করুন।

২. স্ক্রিনের ওপরের ডানদিকে থাকা Layers বা স্তর আইকনে ট্যাপ করুন।

৩. Map Details অংশ থেকে Air Quality নির্বাচন করুন।

৪. এরপর মানচিত্রে বিভিন্ন এলাকার বায়ুর মান রং ও সংখ্যার মাধ্যমে দেখা যাবে। নির্দিষ্ট কোনো স্থানে ট্যাপ করলে সেখানে প্রদর্শিত বায়ুমান সূচক বা একিউআই দেখা যাবে।

বায়ুমান সূচক বা একিউআই কী?

এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) বা বায়ুমান সূচক হলো বাতাসে থাকা বিভিন্ন দূষকের মাত্রাকে একটি সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশের পদ্ধতি। সাধারণভাবে সূচকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বায়ুর মান খারাপ হওয়ার প্রবণতা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে।

বাংলাদেশের জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা অনুসারে:

* ০–৫০ একিউআই: বায়ুর মান ‘ভালো’
* ৫১–১০০ একিউআই: বায়ুর মান ‘মাঝারি’
* ১০১-এর ওপরে: স্পর্শকাতর ও সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বা উদ্বেগজনক অবস্থা

                একনজরে

    সেবা: গুগল ম্যাপস এয়ার কোয়ালিটি
    বাংলাদেশে যুক্ত হয়েছে: ৩৪ জেলা
    মোট জেলা: ৬৪
    বর্তমান কভারেজ: প্রায় ৫৩ শতাংশ জেলা
    তথ্য ও কারিগরি সহায়তা: বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)
    স্টেশন: লাইভ মনিটরিং স্টেশন
    তথ্য পাঠানোর ব্যবধান: প্রায় ৫ মিনিট
    পরিকল্পনা: পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলা যুক্ত করা
    ব্যবহার: বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ধারণা, সচেতনতা ও গবেষণা

ক্যাপসের স্টেশন কী তথ্য দিচ্ছে?

ক্যাপসের পর্যবেক্ষণ স্টেশনগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আপেক্ষিক আর্দ্রতা, অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম২.৫, বস্তুকণা পিএম১০, মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগ বা টিভিওসি, বায়ুমান সূচক এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। কয়েকটি জেলার যন্ত্রে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড পরিমাপের ব্যবস্থাও রয়েছে।

ক্যাপসের তথ্য অনুযায়ী, এসব স্টেশন সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সচল থাকে এবং পাঁচ মিনিট পরপর তথ্য পাঠায়। তবে গুগল বিভিন্ন উৎসের তথ্য সমন্বয় করে সাধারণত ঘণ্টাভিত্তিক বায়ুমান সূচক হিসাব ও প্রদর্শন করে।

গুগল কীভাবে বায়ুর মান হিসাব করে?

গুগল ম্যাপে প্রদর্শিত বায়ুর মানের হিসাব কেবল একটি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের সরাসরি পাঠানো তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ স্টেশন ও বাণিজ্যিক সেন্সরের তথ্যের পাশাপাশি স্যাটেলাইটের উপাত্ত, আবহাওয়ার ধরন, যানবাহনের চাপ, অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমির আচ্ছাদনসংক্রান্ত তথ্যসহ একাধিক উৎস ও মডেল ব্যবহার করে বায়ুর মান নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশে ক্যাপসের পর্যবেক্ষণ স্টেশনগুলো থেকে পাওয়া তথ্য এই ব্যবস্থায় যুক্ত হচ্ছে।

একই জেলার দুই জায়গায় বায়ুর মান আলাদা হতে পারে

গুগল ম্যাপে প্রদর্শিত একিউআই কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বায়ুমান সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। একটি জেলার জন্য একটি নির্দিষ্ট মান দেখানো হলেও জেলার সব জায়গার বাতাসের অবস্থা একই হবে—এমন নয়।

যানবাহনের চাপ, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা, বর্জ্য পোড়ানো, ধুলা ও স্থানীয় আবহাওয়ার কারণে অল্প দূরত্বের মধ্যেও বায়ুদূষণের মাত্রা বদলে যেতে পারে।

এ ছাড়া গুগল ম্যাপে প্রদর্শিত বায়ুমান সূচক এবং কাছাকাছি কোনো পর্যবেক্ষণ স্টেশনের তথ্যের মধ্যে ফারাকও থাকতে পারে। তাই গুগল ম্যাপের একিউআইকে তাৎক্ষণিক সচেতনতা ও সাধারণ ধারণার একটি উপায় হিসেবে দেখা ভালো। এটিকে নির্দিষ্ট স্থানের চূড়ান্ত বা একমাত্র বায়ুমান পরিমাপ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণায় নতুন সুযোগ

ক্যাপস জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে পর্যবেক্ষণ স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এসব স্টেশন থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও থিসিসের কাজ করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দেশের ৬৪ জেলায় পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলে কোথায়, কখন এবং কী ধরনের দূষণ বাড়ছে—সে সম্পর্কে আরও বিস্তৃত তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে এসব তথ্য দূষণের উৎস চিহ্নিত করা, স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের নীতি তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।

তবে এই তথ্যের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে পর্যবেক্ষণযন্ত্রের মান, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ক্যালিব্রেশন এবং সংগৃহীত তথ্যের যাচাইযোগ্যতার ওপর। ক্যাপসের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও পর্যবেক্ষণযন্ত্র ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরাও।

তথ্যসূত্র: ক্যাপস ও গুগল