আলাস্কার গভীর সমুদ্রে নতুন ৯ প্রজাতির স্পঞ্জ

Deep-sea_sponges_NOAA_Fisheries.png
আলাস্কার গভীর সমুদ্রে বটম-ট্রল জরিপে সংগৃহীত স্পঞ্জ ও অন্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী। ছবি: নোয়া ফিশারিজ

আলাস্কার গভীর সমুদ্রে সামুদ্রিক স্পঞ্জের নতুন নয়টি প্রজাতি শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। আলাস্কা উপসাগর ও অ্যালিউশিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সমুদ্রে এসব প্রজাতির আবিষ্কার অঞ্চলটিতে অনাবিষ্কৃত সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের নুতন চিত্র সামনে এনেছে। নতুন আবিষ্কারের ফলে আলাস্কায় পরিচিত স্পঞ্জ প্রজাতির সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২৩২টি।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বা নোয়া গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানায়।

সংস্থাটি জানিয়েছে, নোয়া ফিশারিজ-এর গ্রাউন্ডফিশ ও শেলফিশের মজুত পর্যবেক্ষণের বার্ষিক বটম-ট্রল জরিপে সংগৃহীত নমুনা থেকে এসব স্পঞ্জের সন্ধান মিলেছে। গবেষকেরা ২০১২ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত নমুনাও বিশ্লেষণ করেছেন এবং সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে নতুন প্রজাতিগুলোর বিবরণ দিয়েছেন।

সহজে চেনা যায় না স্পঞ্জ

স্পঞ্জকে অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর মতো বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখে সহজে আলাদা করা যায় না। জটিল অঙ্গ বা স্বতন্ত্র আকৃতির বৈশিষ্ট্য না থাকায় প্রজাতি শনাক্ত করতে বিজ্ঞানীদের মাইক্রোস্কোপিক কঙ্কাল এবং জিনগত উপাদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কাজে ডিএনএ বারকোডিংও ব্যবহার করা হয়েছে।

নোয়া ফিশারিজ-এর আলাস্কা ফিশারিজ সায়েন্স সেন্টারের জীববিজ্ঞানী ও গবেষণার সহলেখক শন রুনি বলেন, স্পঞ্জ সমুদ্রের তলদেশে জটিল কাঠামো তৈরি করে, যা বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছ ও কাঁকড়ার জন্য আবাসস্থল ও আশ্রয় তৈরি করে।

তার মতে, গভীর সমুদ্রের পাথুরে এলাকাগুলোতে গবেষণা করা কঠিন এবং বটম-ট্রল জরিপের মাধ্যমেও এসব স্থানের সবটুকুতে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। ফলে আলাস্কায় এখনো অজানা আরও বহু স্পঞ্জ প্রজাতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

নোয়া-এর নর্থওয়েস্ট ফিশারিজ সায়েন্স সেন্টারের জীববিজ্ঞানী মেরেডিথ এভারেট জানান, স্পঞ্জের ডিএনএ বিশ্লেষণ জটিল। কারণ ছাঁকনি প্রক্রিয়ায় খাদ্য গ্রহণের সময় স্পঞ্জের টিস্যুতে অন্য জীবের ডিএনএ ও এমন কিছু জৈব রাসায়নিক থাকতে পারে, যা পরীক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করে। তারপরও গবেষকেরা আলাস্কার বিভিন্ন প্রজাতির জন্য বেশ কিছু নতুন ডিএনএ বারকোড তৈরি করতে পেরেছেন।

মাছ-কাঁকড়ার আবাসস্থলেও ভূমিকা

স্পঞ্জকে প্রায়ই ‘জীবন্ত জলপাম্প’ বলা হয়। পৃথিবীর প্রাচীনতম বহুকোষী প্রাণীদের মধ্যে থাকা এসব প্রাণীর ইতিহাস ৬০ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো। মস্তিষ্ক বা জটিল অঙ্গ না থাকলেও তারা সমুদ্রের পানি ছেঁকে নেয় এবং সমুদ্রতলে অন্য প্রাণীর জন্য আবাসস্থল তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

আলাস্কার সমুদ্রতলে একটি স্পঞ্জের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছে মা শার্পচিন রকফিশ। ছবি: নোয়া ফিশারিজ

নোয়া ঘন স্পঞ্জসমৃদ্ধ এলাকাকে গুরুত্বপূর্ণ মাছের আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করে। এসব এলাকায় তৈরি আশ্রয় মাছের বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি ও প্রজাতির পুনরুদ্ধারে সহায়ক হতে পারে। স্পঞ্জ নিজেদের শিকারি ও প্রতিদ্বন্দ্বী জীব থেকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক যৌগও তৈরি করে; সেসব যৌগের কিছু ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক বলে ধারণা করা হ্ছে।

আবিষ্কারের পাশাপাশি তলদেশের ওপর চাপ

নতুন প্রজাতির সন্ধান যখন আলাস্কার গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যের অজানা দিক সামনে আনছে, একই সময়ে এসব আবাসস্থল নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলাস্কার গভীর সমুদ্রের স্পঞ্জ সম্প্রদায় বটম ট্রলিং এবং নিকেল ও তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলনের জন্য গভীর সমুদ্র খনন সম্প্রসারণের প্রস্তাবের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গভীর সমুদ্রের খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলন সম্প্রসারণের প্রস্তাব করেছে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এর বিরোধিতা করেছে এবং এসব কর্মকাণ্ডে সমুদ্রতলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে।

সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভার্সিটি-এর আলাস্কা পরিচালক কুপার ফ্রিম্যান বলেন, স্পঞ্জসমৃদ্ধ আবাসস্থল মাছ ও কাঁকড়াকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখে।

তিনি বটম-ট্রল মাছ ধরার সমালোচনা করে বলেন, এতে সমুদ্রতলের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার মতে, এর সঙ্গে সমুদ্রতলে খনিজ উত্তোলন যুক্ত হলে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।

আলাস্কার বাইরে উত্তর মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জ ও গুয়ামের আশপাশসহ প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি ভঙ্গুর সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে গভীর সমুদ্র খনিজ অনুসন্ধানের প্রস্তাব নিয়েও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই আবিষ্কারের তাৎপর্য তাই শুধু নতুন নয়টি প্রজাতি শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে দেখাচ্ছে, গভীর সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখনো কতটা অজানা রয়ে গেছে এবং সেই অজানা বাস্তুতন্ত্রের ওপর মানুষের বিভিন্ন কার্যক্রমের প্রভাব বোঝার প্রয়োজন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র: গার্ডিয়ান