হিমালয়ে হিমবাহ ও তুষারভিত্তিক দুর্যোগের প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না; আন্তঃসীমান্ত নদীপথের কারণে এর ঝুঁকি ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক ক্রায়োস্ফিয়ার-দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশে এ ধরনের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, নদীপথভিত্তিক ঝুঁকি নিরূপণ, তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতার তাগিদ দেওয়া হয়।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ‘ফ্রম দ্য হিমালয়াস টু দ্য ডেল্টা: নেপাল’স রিসেন্ট ক্রায়োস্ফিয়ার ডিজাস্টার, জিএলওএফ রিস্ক অ্যান্ড প্রিপেয়ার্ডনেস প্রাইওরিটিজ ফর বাংলাদেশ’বা ‘হিমালয় থেকে বদ্বীপ: নেপালের সাম্প্রতিক ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগ, জিএলওএফ ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে রিভারাইন পিপল। রাজধানীর বসিলা এলাকায় বুড়িগঙ্গাতীরঘেঁষা নিজস্ব কার্যালয়ে এর আয়োজন করে সংগঠনটি।
এ দুর্যোগে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ৪০৩ জনের প্রাণহানি এবং ৬ হাজার ১৫০ জন নিখোঁজের তথ্য জানিয়েছে নেপাল সরকার। সরকারি প্রাথমিক হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৮ বিলিয়ন বা ৪০ হাজার ৮০০ কোটি নেপালি রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা (১ নেপালি রুপি = ০.৮০ টাকা)।
আলোচক ও অন্য অতিথি যারা
আয়োজক সংগঠন রিভারাইন পিপলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল তাপস রঞ্জন চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় গোলটেবিলে কি-নোট বা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের ডিডিআর এক্সপার্ট উম্মে খাদিজা।
আলোচনায় অংশ নেন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক এ বি এম শামসুল হুদা, জিনবিজ্ঞানী অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক কৃষি, অনুজীব বিজ্ঞান ও জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘লোম বায়ো’র হেড অব সায়েন্টিফিক ইনোভেশন ড. আবেদ চৌধুরী, অগ্রদূত সম্পাদক আবু সাঈদ খান, মেধা সম্পদ সুরক্ষা মঞ্চের সদস্য সচিব আলী নাঈম এবং রিভারাইন পিপলের প্রেসিডেন্ট এফএম আনোয়ার হোসেন, সেক্রেটারি জেনারেল শেখ রোকন ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল নূরুননবী শান্ত।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রিভারাইন পিপলের ট্রাস্টি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলী ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রমেন বিশ্বাস, তরুণ সংবাদকর্মী জুবায়ের হোসেন সজল এবং সংগঠনের কর্মকর্তা ও কর্মীরা।
আলোচনার সূচনা করে অনুষ্ঠান সঞ্চালক ও রিভারাইন পিপলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল তাপস রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব কোনো পর্বত নেই, কিন্তু উজানের বরফ গলে গেলে আমরা ভাটির মানুষ চরম বিপন্ন হই। কেউ যদি হাওড় নিয়ে ভাবে, তবে তাকে মেঘালয় সম্পর্কে জানতে হবে, কারণ হাওড় মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত। একইভাবে দেশের নদী ও পরিবেশের সুরক্ষায় হিমবাহের খবর রাখা এবং গবেষণায় আমাদের যুক্ত হওয়া আবশ্যক।’
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার নদ-নদী, জলাভূমি এবং পানিসম্পদ রক্ষায় কাজ করা সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট এফএম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা শিয়রে হিমালয় আর পায়ে বঙ্গোপসাগরের মাঝে স্যান্ডউইচ হয়ে আছি। উজানে যখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, তখন ভাটির দেশের মতামত নেওয়া হয় না, অথচ তার প্রভাব চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশের ওপরই পড়ে। তাই এই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আমাদের নিজস্ব জোরালো ভয়েস তুলতে হবে।’
নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
গোলটেবিলের মূল প্রবন্ধে গত ২৬ আগস্টে নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়া-গিয়রং এলাকায় ঘটে যাওয়া দুর্যোগকে সাম্প্রতিক ক্রায়োস্ফিয়ার-বিপর্যয় হিসেবে তুলে ধরা হয়। এতে আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের (আইসিমোড) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ঘটনাটি প্রচলিত অর্থে হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা (জিএলওএফ) নয়, বরং লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে সংঘটিত একটি বড় ধরনের বরফ-শিলা ধস (আইস-রক-অ্যাভালাঞ্চ)।
মূল প্রবন্ধ অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ৭ হাজার ২২৭ মিটার উচ্চতার লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর দিক থেকে শিলা ও হিমবাহের বরফ ভেঙে পড়ে। পরে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে পড়ে লহেন্দে খোলা উপত্যকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তী সময়ে তা ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীর দিকে ধাবিত হয়। সকাল ৯টা ৫ মিনিটে প্রথম হাইড্রোলজিক্যাল সতর্কতা পাওয়া গেলেও ততক্ষণে বন্যার প্রবাহ নিচের দিকে পৌঁছে গিয়েছিল।

নেপালের এই প্রলয়ঙ্করী ক্ষতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ২০১৫ সালে সেখানে ভূমিকম্পের পর ২০১৬-১৭ সালে দেশটিতে নিজের কাজ করার স্মৃতিচারণ করেন রিভারাইন পিপলের প্রেসিডেন্ট এফএম আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে যখন এটা হলো, তারপর দিদি (উম্মে খাদিজা) ও রোকনকে (শেখ রোকন) বলছিলাম যে নেপাল যাওয়া দরকার। কারণ আমার অনেক বন্ধু-বান্ধব অ্যাফেক্টেড হলো কিনা দেখা দরকার। ১৫-তে ভূমিকম্পের পর রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম করেছিলাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কোরের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর হিসেবে। তো (এবার) ঘটনাটা যেখানে হয়েছে সেই জায়গাটা আমার ট্রাভেল করা এবং সেখানে হেলথ সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। তো আমি প্রথমেই টেলিফোন করে জেনেছিলাম যে সেন্টার ঠিক আছে কি না! হেলথ সেন্টারগুলো যে গ্লেসিয়াল ব্লাস্টটা যেভাবে এসেছে তারও ওপরের লেভেলে ছিল, যার জন্য হেলথ সেন্টার নষ্ট হয়নি।’
আনোয়ার আরও হোসেন বলেন, ‘এই দুর্যোগে ১৩টিরও বেশি হাইড্রো-পাওয়ার প্ল্যান্ট নষ্ট হয়ে গেছে এবং বহু অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এসব হাইড্রো-পাওয়ার প্রকল্প তৈরির সময় ভাটির দেশকে জানানো হয়নি, কিন্তু এর সামগ্রিক প্রভাব আমাদের বহন করতে হচ্ছে।’
জিএলওএফ কী এবং কেন ঝুঁকিপূর্ণ
জিএলওএফ হলো হিমবাহ-উৎসারিত কোনো হ্রদ থেকে আকস্মিকভাবে বিপুল পরিমাণ পানি বেরিয়ে গিয়ে সৃষ্ট দ্রুতগতির বন্যা। হ্রদের পানি ধরে রাখা প্রাকৃতিক বাঁধ (যেমন মোরেইন, বরফ বা শিলাস্তর) দুর্বল হয়ে পড়লে কিংবা পানি উপচে পড়লে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
দ্রুত প্রবাহ ও বিধ্বংসী ক্ষমতা: এটি খুব অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ কাদা, শিলা ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে ধেয়ে আসে, যার ফলে আগাম সতর্কতার জন্য প্রায় কোনো সময় পাওয়া যায় না।
প্রাকৃতিক ট্রিগার: ভূমিধস, বরফ পতন, অতিবৃষ্টি, দ্রুত তুষারগলন বা ভূমিকম্পের মতো ঘটনা হ্রদের বাঁধ ভাঙার অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকির চাপ
কি-নোটে জলবায়ু পরিবর্তনকে জিএলওএফ ঝুঁকির অন্যতম ‘রিস্ক মাল্টিপ্লায়ার’ বা ঝুঁকি গুণক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাপমাত্রা বাড়লে হিমবাহ দ্রুত সরে যেতে পারে, নতুন বা বড় হিমবাহ-হ্রদ তৈরি হতে পারে এবং গলিত পানির পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পারমাফ্রস্ট বা প্রাকৃতিক বাঁধ গলে পাহাড়ের শিলা ও ঢাল আরও অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু নেট জিরো নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এই বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমে থাকা ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো মাটি ও কৃষির মাধ্যমে সক্রিয়ভাবে রিমুভাল (অপসারণ) করতে হবে, তা না হলে পৃথিবীর উষ্ণায়ন বা হিমবাহ গলে যাওয়া থামানো সম্ভব নয়।’
ঝুঁকিতে হাজারো হিমবাহ-হ্রদ
কি-নোটে আইসিমোড-এর ২০২০ সালের তালিকা তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, নেপাল ও সংলগ্ন আন্তঃসীমান্ত হিমালয় অঞ্চলে শূন্য দশমিক শূন শূন্য তিন বর্গকিলোমিটার বা তার বেশি আয়তনের ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ-হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছিল।
হ্রদের ভৌগোলিক অবস্থান: এর মধ্যে নেপালে ২ হাজার ৭০টি, চীনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে ১ হাজার ৫০৯টি এবং ভারতে ৪৫টি হ্রদ রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদ: ৪৭টি হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যার মধ্যে নেপালে ২১টি, চীনে ২৫টি এবং ভারতে একটি। ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলোর মধ্যে ৪২টি কোশি, তিনটি গান্ধকী এবং দুটি কার্নালি অববাহিকায় অবস্থিত।
ঝুঁকি কমাতে নেপালের অভিজ্ঞতা
মূল প্রবন্ধে নেপালে ইমজা হ্রদের পানি ৩ দশমিক ৪ মিটার কমিয়ে সম্ভাব্য আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি হ্রাসের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি ৫০ কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় সাইরেন বসিয়ে স্থানীয়দের সতর্কতার আওতায় আনার তথ্যও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ কেন উদ্বিগ্ন ও সম্ভাব্য প্রভাব
হিমালয়ের পানি বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কি-নোটে বলা হয়েছে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (জিবিএম) অববাহিকার মাত্র ৭ শতাংশ বাংলাদেশে হলেও এর ৯২ শতাংশ পানি ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদী দিয়েই বঙ্গোপসাগরে নিষ্কাশিত হয়।
তবে উজানে কোনো জিএলওএফ ঘটলেই বাংলাদেশে সরাসরি একই মাত্রায় বন্যা পৌঁছাবে—এমনটি ধরে না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভাটিতে পৌঁছানোর দূরত্ব, নদীর প্রশস্ততা ও মৌসুমি প্রবাহের কারণে বন্যার রূপ পরিবর্তিত হয়। তবে একক বন্যার চেয়ে এটি যৌথ ও পদ্ধতিগত (কম্পাউন্ড অ্যান্ড সিস্টেমেটিক ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি
কি-নোটের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২, স্ট্যান্ডিং অডার্স অন ডিজাস্টার (এসওডি) ২০১৯ এবং বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) মতো শক্তিশালী কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও জাতীয় নীতিতে জিএলওএফ বা হিমবাহ দুর্যোগের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি এখনও আলাদাভাবে গড়ে ওঠেনি। তাই উজানের জিএলওএফ সতর্কতা, সম্ভাব্য ফ্লাড রাউটিং সিনারিও এবং প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনাকে বিদ্যমান বন্যা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক এ বি এম শামসুল হুদা বলেন, ‘১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে বাংলাদেশে দুর্যোগ মোকাবিলায় যে ঐতিহ্য ও সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটাকে এখন জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমবাহ গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ ধরনের ব্যাপক গবেষণা কেবল রিভারাইন পিপলের মতো একক সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়; এতে সরকার, আন্তঃসরকারি সংস্থা ও ভূ-তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় প্রয়োজন।’
বহুপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার তাগিদ
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর গণ্ডি পেরিয়ে অববাহিকাভিত্তিক বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তারা বলেছেন, হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত নদী ও পরিবেশগত ব্যবস্থাকে আলাদা আলাদা দেশের সীমানার মধ্যে দেখলে ঝুঁকির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন।
রিভারাইন পিপলের সেক্রেটারি জেনারেল শেখ রোকন বলেন, ‘শুধুমাত্র ভারত-বাংলাদেশ বা ভারত-নেপাল দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দিয়ে এই আঞ্চলিক ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়। ভারতকেও যদি নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়; তবে ভারত, নেপাল, চীন ও বাংলাদেশ মিলে একটি বহুপক্ষীয় ও বহুমাত্রিক কৌশল তৈরি করতে হবে। এতে কেবল নদীর পানি নয়; হিমবাহ, বরফ, ড্যাম এবং উচ্চভূমির অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকেও যৌথ আলোচনার আওতায় আনতে হবে।’
মূল প্রবন্ধেও আইসিমোড ও উজানের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের পূর্বাভাস ব্যবস্থার সংযোগ তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জিএলওএফ ও মৌসুমি বন্যার যৌথ পরিস্থিতি ধরে বিভিন্ন সিনারিও মডেল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার নিয়ে অগ্রদূত সম্পাদক আবু সাইদ খান বলেন, ‘সার্ক রাজনৈতিক কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকলেও বিমসটেক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাকে এই জলবায়ু ও হিমবাহ দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।’
বিজ্ঞান, স্থানীয় জ্ঞান ও সংস্কৃতির সমন্বয়
প্রযুক্তিগত আগাম সতর্কতার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের প্রথাগত জ্ঞান ও স্থানীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় প্রাধান্য পায়। বক্তারা মনে করেন, নদী, পাহাড়, হাওড় বা উপকূলের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ঝুঁকি শনাক্তকরণে সহায়ক হতে পারে।
আজাদ কাশ্মীরের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হিমবাহ সুরক্ষার অনন্য প্রথা তুলে ধরে সঞ্চালক তাপস রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের একটি কমিউনিটি হিমবাহ কালচে হয়ে গেলে সেটিকে বিপর্যয়ের সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে। উনাদের একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস রয়েছে, যেখানে হিমবাহকে বাঁচিয়ে রাখতে কমিউনিটির একজন সদস্য প্রতীকীভাবে হিমবাহকে বিয়ে করেন এবং সারাজীবন এর রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পুরো কমিউনিটি বিশ্বাস করে যে হিমবাহ টিকে থাকার ওপরই তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নির্ভর করছে।’
তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে রিভারাইন পিপলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল নুরুননবী শান্ত বলেন, ‘কোন কোন নদী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে বাংলাদেশে এসেছে তা চিহ্নিত করার পাশাপাশি নদী পারের মানুষের ঐতিহ্য, লোকজ বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে ঝুঁকি মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। প্রকৃতির সুরক্ষায় ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান ও লোকজ সচেতনতা অনেক বড় ভূমিকা পালন করে।’

স্মরণে সংহতি প্রকাশ
অনুষ্ঠানে নেপালের রাসুয়া–গিয়রং দুর্যোগ ও এর পরবর্তী বন্যায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ এবং এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
একইসঙ্গে ভয়ানক এ দুর্যোগে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের খোঁজে আকুল পরিবার, নতুন করে জীবন গড়ার লড়াইয়ে থাকা দুর্ঘটনাকবলিত মানুষ, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিয়োজিত উদ্ধারকর্মী এবং নেপাল ও তিব্বতজুড়ে গভীর শোক বহনকারী জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতিও জানানো হয়।
আয়োজকদের তরফে বলা হয়, ‘এই স্মরণ যেন বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানকে আগাম পদক্ষেপে এবং পারস্পরিক সংহতিকে সুরক্ষায় পরিণত করার আমাদের সংকল্পকে আরও শক্তিশালী করে।’
গোলটেবিল বৈঠকের সমাপনীতে আলোচকরা একমত হন যে, হিমালয়ের দুর্যোগের প্রভাব অনুমানের ওপর নির্ভর করে নয়, বরং অববাহিকাভিত্তিক যৌথ মডেলিং, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমেই বাংলাদেশের জন্য কার্যকর আগাম সতর্কতা ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা সম্ভব।