সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) নিরাপত্তা নিয়ে বেশ কিছু চমকপ্রদ দাবি সামনে এসেছে। বলা হচ্ছে, আগামী এক দশকে এআইয়ের কারণে মানবজাতির নিশ্চিহ্ন হওয়ার সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি; সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই পারমাণবিক অস্ত্রের সমপর্যায়ের বা তার চেয়েও বড় হুমকি হতে পারে; একটি ‘বটনেট’ পুরো ইন্টারনেটকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এসব সতর্কতার পেছনে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর স্বার্থও কাজ করতে পারে।
তাহলে এসব দাবির ভিত্তি কতটা শক্ত? এআই কি সত্যিই এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে বিপর্যয় ঘটাবে? আর উন্নত এআইয়ের বিকাশের গতি কমানোই কি এর ঝুঁকি মোকাবিলার পথ?
নিচে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ দাবি এবং সেগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমত তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
> “৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে... একটি স্বয়ংক্রিয় দল স্থায়ী বটনেটের মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেট দখলে নিতে সক্ষম হতে পারে—যার ফলে সম্ভাব্যভাবে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে।”—দারিও আমোদেই, অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এআই নিয়ে সংশয়ী এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক গ্যারি মার্কাস বলেন, আমোদেইয়ের উদ্বেগ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে বিষয়টি বড় ধরনের সংশয় নিয়ে দেখা দরকার।
তার মতে, পুরো ইন্টারনেট ঝুঁকিতে পড়বে—এমন দাবি অর্থহীন। অতি মাত্রার অবহেলা ছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হবে, তা-ও বেশ অস্পষ্ট।
মার্কাস এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের একটি মূল্যায়নের কথা তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছে, অ্যানথ্রপিকের বর্তমান শীর্ষস্থানীয় এআইগুলোর একটি ‘মাইথোস’ কেবল ছোট ও দুর্বলভাবে সুরক্ষিত ঝুঁকিপূর্ণ সিস্টেমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে।
ইন্টারনেটের বড় একটি অংশ ক্লাউডফ্লেয়ার, গুগল ও অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) মালিকানাধীন কম্পিউটার অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল বলে জানান তিনি। দুই সহকর্মীর সঙ্গে আমোদেইয়ের বক্তব্য মূল্যায়ন করে মার্কাস বলেন, সরকারি শক্তি প্রয়োগ ছাড়া এসব কোম্পানির কোনো একটিকে দীর্ঘ সময়ের জন্য অচল বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত ব্যক্তিগত ওয়েবসাইট আক্রান্ত হতে পারে বলে মত দেন তারা। তাদের ভাষ্য, “ইন্টারনেট নিজেই ধসে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম।”
এদিকে ওপেনএআইয়ের এজেন্টদের হামলার শিকার হওয়া হাগিং ফেসের প্রকৌশলী নিলস রোগে ইন্টারনেট দখলের দাবিকে “অদ্ভুত অর্থহীন কথা” বলে অভিহিত করেছেন।
তার মতে, হাগিং ফেসে হামলার ঘটনা ঘটেছিল মানুষের যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে এবং এমন বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা ব্যবহার করে, যা কেবল ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানই বহন করতে পারে।
এক বছরের মধ্যে এআই ইন্টারনেট দখলে নিতে পারে—আমোদেইয়ের এই মূল্যায়নের সঙ্গে অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লাকের বক্তব্যেরও তুলনা করা হচ্ছে। ১৪ সেপ্টেম্বর ক্লার্ক বলেছেন, এআই “বিপজ্জনক কাজ করা শুরু করবে”—এমন সময় আসতে প্রায় ২০ বছর লাগতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সারের সেন্টার ফর সাইবার সিকিউরিটির অধ্যাপক অ্যালান উডওয়ার্ড বলেন, বটনেট সাধারণত একটি পর্যায়ে থেমে যায়। কারণ ইন্টারনেট একক কোনো কাঠামো নয় এবং এর সব অংশে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে পারে—এমন বটনেট তৈরি করা কঠিন। ইন্টারনেট ট্রাফিকও তুলনামূলকভাবে স্থিতিস্থাপক; ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এড়িয়ে অন্য পথেও তা চলাচল করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, “এআই নিজেরা সিদ্ধান্ত নিয়ে এটি করবে না। এর জন্য দায়ী মানুষ এবং এআই হলো একটি হাতিয়ার। আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে সেটিকেই—এআইকে নয়।”
> “আমরা সত্যিই আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি, এআই সব মানুষকে হত্যা করতে পারে! আমার ব্যক্তিগত ধারণা, আগামী এক দশকে এর সম্ভাবনা ১০ শতাংশের বেশি।”—ইভান হাবিঙ্গার, অ্যানথ্রপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স লিড, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এ বক্তব্য এআই জগতে ‘পি-ডুম’ বা p(doom) নামে পরিচিত একটি ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর অর্থ হলো—এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে গিয়ে এমন বিপর্যয় ঘটাতে পারে, যাতে মানবজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সম্ভাব্য পরিস্থিতির উদাহরণ হিসেবে শক্তিশালী জীবাণু অস্ত্র তৈরি বা বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা ধ্বংসের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়।
এই সপ্তাহে প্রকাশিত গবেষকদের পূর্বাভাসভিত্তিক একটি জরিপে তাদের কাছে ‘উন্নত এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তি অথবা একই ধরনের স্থায়ী ও গুরুতর ক্ষমতাহীনতার সম্ভাবনা’ একটি সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।
তবে এআই নাও ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হেইডি খলাফ অস্তিত্বগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনাকে শতাংশে প্রকাশ করার বিষয়ে সংশয়ী। তার ভাষ্য, “এই দাবিগুলোকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার উপায় নেই, আবার যাচাইও করা যায় না। ফলে এগুলো স্বভাবগতভাবেই বৈজ্ঞানিক নয়।”
খলাফ বলেন, একটি ‘সুপারইন্টেলিজেন্ট’ এআই কীভাবে ‘ধ্বংস’ ঘটাতে পারে, তার সুনির্দিষ্ট উদাহরণের ঘাটতি বিষয়টিকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে। অ্যানথ্রপিকের চিন্তাভাবনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রও স্বীকার করেছে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের সঠিক সম্ভাবনা সম্ভবত জানা অসম্ভব।
“আপনি যদি এর পক্ষে এমন প্রমাণ দিতে না পারেন, তাহলে ‘মানব বিলুপ্তি’র জন্য যে সংখ্যাগুলো তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোরও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।”, যোগ করেন তিনি।
সমালোচকদের বক্তব্য, এ ধরনের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক গবেষণা না করেই বিজ্ঞানের কর্তৃত্ব ধার করার চেষ্টা।
তবে ঝুঁকির পরিমাণ নির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রকাশ করা কঠিন হলেও, এর কিছু গুণগত উদাহরণ রয়েছে। এআই নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির সম্ভাবনাও আলোচিত হয়েছে।
জুলাইয়ে ওপেনএআই নিশ্চিত করে যে একটি নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করা এআই এজেন্টগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। এজেন্টগুলো একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ, সমন্বয় এবং কৌশল নির্ধারণ করে একটি জটিল ‘সোয়র্ম’ বা দলগত কাঠামোর মাধ্যমে ইন্টারনেটের অন্য অংশে হামলার চেষ্টা করেছিল।
এদিকে ওপেনএআইয়ের গবেষক ড্যান সেলসাম বলেন, সর্বশক্তিমান এআই এমন একটি “নিয়ন্ত্রণহীন শিল্পায়ন” ঘটাতে পারে, যা পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী করে তুলবে।
অ্যানথ্রপিকও গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তারা এমন পাঁচটি ঘটনা শনাক্ত করেছে, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ তাদের মডেল এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যা জীবাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
> “আমার মনে হয়, এই সাইক অপের (ভালো শব্দের অভাবে যাকে এভাবেই বলছি) ভিত্তি অনেক আগে থেকেই তৈরি করা হয়েছে। এটি ছিল সেই দেশলাই, যা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।”—ইলন মাস্ক, স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
মাস্কের ‘সাইক অপ’ বা মনস্তাত্ত্বিক অভিযানের মন্তব্যটি এমন একটি যুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে বলা হয়—বড় এআই কোম্পানিগুলো প্রযুক্তিটির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানাচ্ছে, যাতে উন্নত এআই তৈরির ক্ষেত্রে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রবেশ কঠিন হয়ে যায়।
যদি সরকারগুলো এখন অত্যাধুনিক এআই উন্নয়নে বিধিনিষেধ আরোপ করে, তাহলে নতুন স্টার্টআপগুলোর পক্ষে সেই বিধি মেনে চলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবল জোগাড় করা কতটা সম্ভব হবে—এমন প্রশ্নও উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ১৪ সেপ্টেম্বর বলেছেন, এতগুলো শীর্ষস্থানীয় এআই প্রযুক্তি কোম্পানি সরকারের কাছে এসে তাদের নিয়ন্ত্রণ করার অনুরোধ করছে—বিষয়টি তার কাছে ‘কিছুটা অদ্ভুত’ মনে হয়।
তিনি বলেন, এটি তার কাছে ‘ট্রোজান হর্স’-এর মতো মনে হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক বলেন, এআই খাতের মূল খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম থাকতেই সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এতে এমন একটি ‘নীতিগত কাঠামো’ তৈরি করা সহজ হবে, যা দুর্ঘটনা ঠেকাতে এবং প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া প্রতিরোধ করতে পারে।
সমালোচকেরা এটিকে ‘রেগুলেটরি ক্যাপচার’ বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার কৌশল হিসেবে দেখেন। তাদের যুক্তি, এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অগ্রগতি ধীর করে দিতে পারে।
তবে অন্যরা মনে করেন, আমোদেইয়ের ঝুঁকি নিয়ে সতর্কতা এবং নিয়ন্ত্রণের আহ্বান আন্তরিক।
আধুনিক এআইয়ের অন্যতম পথিকৃৎ কানাডীয় কম্পিউটার বিজ্ঞানী ইয়োশুয়া বেঙ্গিও, যিনি দ্রুতগতিতে এআই উন্নয়নের বিরোধিতা করে আসছেন, মনে করেন না যে এটি কোনো জটিল লবিং পরিকল্পনা।
তার মতে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নেওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য, যেখানে মূল্যায়ন ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, এআই উন্নয়নের গতি কমানো নিজেদের স্বার্থে নয়।
বেঙ্গিওর ভাষ্য, “সরকারগুলো যদি তারা যে বিষয়টি চাইছে—অর্থাৎ বিপর্যয়কর ঝুঁকি এড়াতে উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ—তা আরোপ করে, তাহলে আর্থিকভাবে তাদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।”
> “একটি সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই পারমাণবিক অস্ত্রের সমপর্যায়ের, সম্ভবত তার চেয়েও বড় মাত্রার হুমকি তৈরি করে।”—ডেস ব্রাউন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই গভর্ন্যান্স উদ্যোগের জ্যেষ্ঠ গবেষক টবি অর্ড বলেন, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি পুরোপুরি সঠিক। আমরা যেমন পারমাণবিক বোমাকে আবিষ্কার না-হওয়া অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারি না, তেমনি এমন এআই ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার পর, যা মানব সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে, তখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে পেছনে ফেরা।”
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই এখনো বাস্তবে অস্তিত্বশীল নয় এবং এটি তৈরি হবেই—এমন নিশ্চয়তাও নেই।
নিরাপত্তাকেন্দ্রিক এআই ফিউচার্স প্রজেক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এমন প্রযুক্তি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের আগে তৈরি হবে না। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছেন, এটি ২০৩৫ সাল পর্যন্তও সময় নিতে পারে।
র্যান্ড করপোরেশনের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্রের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কঠোর সুরক্ষা থাকায় এআই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কারণ হতে পারে না। তবে এই মূল্যায়ন এমন কিছু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা অস্ত্র ব্যবস্থাপনায় এআই যুক্ত করবেন না।
জাতিসংঘও ডিসেম্বরে একটি সিদ্ধান্তে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বজায় রাখার কথা বলেছে।
তবে এআই অন্যভাবেও পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, এআই বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের দায়িত্বে থাকা মানুষদের প্রভাবিত করতে পারে—যেমন মিথ্যাভাবে বোঝাতে পারে যে কোনো প্রতিপক্ষ পারমাণবিক হামলা চালাতে যাচ্ছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপন্স সতর্ক করে বলেছে, “সাইবার হামলার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা যে তথ্য পান, তা পরিবর্তন করা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব হতে পারে।”
সংস্থাটির মতে, এআই যুদ্ধের অন্যান্য ক্ষেত্রও দ্রুততর করতে পারে এবং মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আরও কমিয়ে দিতে পারে।
>“এটা ধীর করতে হবে—এ কথা না বললে আপনাকে নির্বোধ হতে হবে।”—বার্নি স্যান্ডার্স, যুক্তরাষ্ট্রের ভারমন্টের ডেমোক্র্যাট সিনেটর, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
স্যান্ডার্স সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরিতে নিষেধাজ্ঞা এবং উন্নত এআইয়ের উন্নয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করার পক্ষে। এ ক্ষেত্রে তিনি এআই শিল্পের এমন নেতাদের বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা নিজেরাই বলছেন যে তারা বিপজ্জনক একটি প্রযুক্তি তৈরি করছেন।
তবে উন্নয়নের গতি কমানোর বিরোধিতাও রয়েছে।
ধীরগতির বিরোধিতাকারীদের মধ্যে অন্যতম খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সপ্তাহে এ আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় একমাত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হলো একজন “শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান (উচ্চ আইকিউ!) প্রেসিডেন্ট”। তিনি এআই ও ডেটাসেন্টারের বিরুদ্ধে একটি “অসুস্থ ষড়যন্ত্র” রয়েছে বলেও দাবি করেন এবং বলেন, এতে একমাত্র চীনই খুশি।
ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের কম্পিউটার বিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক পেদ্রো ডোমিঙ্গোস গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকা ‘অ্যাকসেলারেশনিস্ট’দের একজন। তিনি বলেন, “এআইকে আরও ভালোভাবে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণের পথ হলো আরও গবেষণা করা, কম গবেষণা নয়। এর পথে বাধা তৈরি করাই হবে সত্যিকারের দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ।”
প্যালান্টিরের প্রধান নির্বাহী অ্যালেক্স কার্প বলেন, “আমাদের যে প্রতিপক্ষরা রয়েছে, তারা যদি না থাকত, তাহলে আমি এই প্রযুক্তি পুরোপুরি স্থগিত করার পক্ষে থাকতাম। কিন্তু তারা আছে। কাঠামোগত সুবিধা থাকায় এটিকে থামানো সম্ভব নয়।”
>“চীন যদি এ ক্ষেত্রে আমাদের ছাড়িয়ে যায়, তাহলে আগামীকাল বলে আর কিছু থাকবে না। তারা যদি এআইয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে যায়, তাহলে অন্য কোনো বিষয়ই আর গুরুত্বপূর্ণ হবে না।”—স্কট বেসেন্ট, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
এআই উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগী। একটি মত হলো, চীনের কাছে নেতৃত্ব চলে গেলে পরিস্থিতি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে এআই উন্নয়নে ধীরগতি আনার বিরোধিতা করা হয়।
এআইকে এ ক্ষেত্রে শীতল যুদ্ধের সময়ের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার মতো একটি ‘সুপার-অস্ত্র’ হিসেবেও দেখা হয়। অর্থাৎ এআই মডেলগুলোকে ‘ব্যাপক ধ্বংসাত্বক অস্ত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাস্তবে এআই বিভিন্ন ধরনের বিস্তৃত প্রয়োগসমৃদ্ধ প্রযুক্তির সমষ্টি।
আমোদেই বলেছেন, “এআইয়ে চীন এগিয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য গুরুতর বিপদ তৈরি হবে।”
তবে চীনা সরকারের এক মুখপাত্র এর জবাবে বলেছেন, “ভয় দেখানো, সংঘাত এবং হিংস্র প্রতিযোগিতা কেবল বৈশ্বিক এআই শাসনব্যবস্থার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে, যা কারও স্বার্থে নয়।”
কিছু বিশ্লেষক আবার ওয়াশিংটন ও অ্যানথ্রপিকের চীন-হুমকি তুলে ধরার পেছনে অন্য উদ্দেশ্যও দেখতে পান। হাগিং ফেসে কাজ করা এক প্রকৌশলী পরামর্শ দিয়েছেন, উন্নত এআইয়ের বিকাশের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য আমোদেইয়ের আহ্বানের পেছনে সস্তা ও ওপেন-সোর্স চীনা এআই মডেলগুলোর অগ্রগতি ঠেকানোর ইচ্ছা থাকতে পারে।
এসব মডেলের সক্ষমতা ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মডেলগুলোর কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পার্থক্য হলো, এসব মডেলের সোর্স কোড যে কেউ ব্যবহার করতে পারে এবং এগুলোর জন্য ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় না।
এগুলো অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের লাভজনক হয়ে ওঠার পরিকল্পনার জন্য বড় ধরনের প্রতিযোগিতামূলক চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে বিপুল আর্থিক স্বার্থও জড়িত।
• তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ানে ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক্সপ্লেইনার; ইংরেজি থেকে অনূদিত
লেখক: রবার্ট বুথ, গার্ডিয়ানের ইউকে টেকনোলজি এডিটর; ড্যান মিলমো, গার্ডিয়ানের গ্লোবাল টেকনোলজি এডিটর এবং আইশা ডাউন, গার্ডিয়ানের গ্লোবাল টেকনোলজি রিপোর্টার