হিমালয়ের বুকে জীবন্ত গালিচা, ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স

হিমালয়ের ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সে রঙিন আলপাইন ফুলে ঢাকা উপত্যকা। ছবি: পেক্সেলস
বর্ষায় রঙিন বুনো ফুলে ঢেকে যায় ভারতের উত্তরাখণ্ডের ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স। ছবি: পেক্সেলস

মেঘছোঁয়া উচ্চতায় রুক্ষ পাহাড়ের নিস্তব্ধতা। চারপাশে বুনো বাতাসের গুনগুনানি। আর পাহাড়ের ঢালজুড়ে যতদূর চোখ যায়, ছড়িয়ে আছে নানা রঙের বুনো ফুল। কোথাও বেগুনি, কোথাও হলুদ, আবার কোথাও সাদা কিংবা নীল—মনে হয় প্রকৃতি নিজ হাতে এঁকেছে এক বিশাল ক্যানভাস।

হিমালয়ের পশ্চিম অংশে লুকিয়ে থাকা এই উপত্যকাটিই ‘ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স’ বা পুষ্প উপত্যকা। বর্ষা মৌসুমে এখানে আলপাইন ফুলের সমারোহে বদলে যায় পুরো ভূদৃশ্য। উচ্চতার কারণে বছরের বড় একটি সময় তুষার ও শীতের আবরণে ঢাকা থাকা উপত্যকাটি অল্প সময়ের জন্য হয়ে ওঠে রঙের উৎসব।

ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃত ভারতের উত্তরাখণ্ডের ‘নন্দা দেবী অ্যান্ড ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স ন্যাশনাল পার্কস’-এর অংশ এই উপত্যকা। সংস্থাটির মতে, এটি পশ্চিম হিমালয়ের অন্যতম অসাধারণ উচ্চভূমির প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য, যেখানে রয়েছে আলপাইন ফুলের বিস্তৃত তৃণভূমি এবং গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় পরিচিতি থেকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এই উপত্যকা বহু আগে থেকেই পরিচিত ছিল। তবে বহির্বিশ্বে এর পরিচিতি বাড়ে বিংশ শতকের শুরুতে।

১৯৩১ সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী ফ্রাঙ্ক এস. স্মিথে (Frank S. Smythe) ও তার সহযাত্রীরা কামেট পর্বত অভিযান শেষে ফেরার পথে এই উপত্যকার মধ্য দিয়ে যান। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে তারা এখানে এসে পৌঁছান এবং উপত্যকার অসাধারণ ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন।

তবে উপত্যকাটিকে গভীরভাবে অনুসন্ধান ও এর উদ্ভিদবৈচিত্র্য নথিবদ্ধ করার জন্য স্মিথে আবার ফিরে আসেন ১৯৩৭ সালে। পরের বছর প্রকাশিত হয় তার বিখ্যাত বই ‘ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স’। বইটি হিমালয়ের এই দূরবর্তী উপত্যকাকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে আরও পরিচিত করে তোলে। 

১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হয় ‘ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স’। ছবি: সংগৃহীত

এরপর উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও গবেষকদের আগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকে। ১৯৩৯ সালে রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনস, কিউ-এর উদ্ভিদবিজ্ঞানী জোয়ান মার্গারেট লেগও এ উপত্যকায় গবেষণার কাজে আসেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জরিপে এখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্যের বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে।

২০০৫ সালে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স ন্যাশনাল পার্ককে নন্দা দেবী ন্যাশনাল পার্কের সঙ্গে মিলিয়ে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মূল বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃতি আসে ১৯৮৮ সালে নন্দা দেবী ন্যাশনাল পার্কের মাধ্যমে।

জীবন্ত পুষ্পভাণ্ডার

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ফুল। বিভিন্ন জরিপে উপত্যকা ও আশপাশের এলাকায় শত শত প্রজাতির উদ্ভিদের উপস্থিতি নথিবদ্ধ হয়েছে। ইউনেসকোর মূল্যায়ন নথিতে ১৯৮৭ সালের একটি জরিপে ৬১৩টি উদ্ভিদ প্রজাতির উল্লেখ রয়েছে।

নীল হিমালয়ান পপি, ব্রহ্মকমল, অ্যানিমোন, প্রাইমুলা, পটেনটিলা, রডোডেনড্রনসহ নানা প্রজাতির আলপাইন উদ্ভিদ মৌসুমে উপত্যকার রূপ বদলে দেয়। সব ফুল একই সময়ে ফোটে না। ফলে মৌসুম এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় উপত্যকার রং ও দৃশ্য।

এই কারণেই ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সকে একবার দেখে তার পুরো সৌন্দর্য বোঝা কঠিন। বর্ষার শুরুতে যে রং দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহ পর সেখানে ফুটে উঠতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো ফুলের সমারোহ।

উদ্ভিদবৈচিত্র্যের পাশাপাশি এই জাতীয় উদ্যান গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর আবাসও। ইউনেসকো এখানে তুষার চিতা, হিমালয়ান কস্তুরী হরিণ, এশীয় কালো ভালুকসহ বিভিন্ন বিরল ও বিপন্ন প্রাণীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করেছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশের কারণে দর্শনার্থীদের সামনে এসব প্রাণীর দেখা পাওয়া বিরল।

ফুলের উপত্যকার পথও এক রোমাঞ্চ

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের সৌন্দর্যের বড় একটি অংশ লুকিয়ে আছে সেখানে পৌঁছানোর পথে।

উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার গোবিন্দঘাট থেকে শুরু হয় ট্রেক। সেখান থেকে ঘাঙ্গারিয়া হয়ে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সে পৌঁছাতে হয়। ঘাঙ্গারিয়া এই উপত্যকা এবং কাছের হেমকুণ্ড সাহিবের পথের গুরুত্বপূর্ণ বেস ক্যাম্প। উত্তরাখণ্ড পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গোবিন্দঘাট থেকে ঘাঙ্গারিয়া পর্যন্ত ট্রেক প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং ঘাঙ্গারিয়া থেকে উপত্যকার প্রবেশপথ প্রায় ৪ কিলোমিটার।

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের পথে পর্যটকেরা। ছবি: সংগৃহীত

পথে রয়েছে ঘন বন, পাহাড়ি ঝরনা, নদী, জলপ্রপাত আর কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের ঢাল। কখনো পথ সরু হয়ে আসে, কখনো সামনে খুলে যায় বিশাল পাহাড়ি দৃশ্য। ফলে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই শুরু হয়ে যায় প্রকৃতির সঙ্গে এক দীর্ঘ ভ্রমণ।

উত্তরাখণ্ড পর্যটন দপ্তর এই ট্রেককে মাঝারি থেকে চ্যালেঞ্জিং মাত্রার হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

কখন যাবেন?

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স বছরের অধিকাংশ সময় তুষার ও শীতের আবহে থাকে। পর্যটন মৌসুম সাধারণত জুন থেকে অক্টোবরের মধ্যে। তবে ফুলের সমারোহ দেখার জন্য বর্ষাকালই সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময়।

জুলাই ও আগস্টে উপত্যকায় ফুলের বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। মৌসুমের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক প্রজাতির ফুল ফোটে। ফলে একই মৌসুমে দুবার গেলেও উপত্যকার রূপ এক নাও হতে পারে।

সেপ্টেম্বরের দিকে অনেক ফুল বিবর্ণ হতে শুরু করে। তবে এ সময় আকাশ তুলনামূলক পরিষ্কার থাকার কারণে হিমালয়ের পর্বতশ্রেণির দৃশ্য আরও স্পষ্টভাবে দেখা যেতে পারে।

কীভাবে যাবেন?

বাংলাদেশ বা ঢাকা থেকে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্স যেতে হলে প্রথমে উত্তরাখণ্ডের দেরাদুনে পৌঁছাতে হবে। আকাশপথে দেরাদুনের জলি গ্রান্ট বিমানবন্দর সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর। ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় সাধারণত ভারতের কোনো বড় শহর হয়ে দেরাদুনে যেতে হয়।

দেরাদুন থেকে সড়কপথে যেতে হবে চামোলি জেলার গোবিন্দঘাটে। উত্তরাখণ্ড পর্যটন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেরাদুন থেকে গোবিন্দঘাটের দূরত্ব প্রায় ৩১০ কিলোমিটার। সড়কপথে এই যাত্রায় প্রায় ১০–১১ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। গোবিন্দঘাট থেকেই শুরু হবে পাহাড়ি ট্রেকের মূল পর্ব।

গোবিন্দঘাট থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হবে ঘাঙ্গারিয়ায়। এখান থেকে আরও প্রায় ৪ কিলোমিটার ট্রেক করে ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের মূল উপত্যকায় প্রবেশ করা যায়।

রেলপথে যেতে চাইলে ভারতের রেল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে দেরাদুন বা ঋষিকেশে পৌঁছে সেখান থেকে সড়কপথে গোবিন্দঘাট যাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পর্যটকের জন্য কোন রুটটি সুবিধাজনক হবে, তা নির্ভর করবে ভিসা, ফ্লাইট বা ট্রেনের সময়সূচি এবং ভ্রমণ পরিকল্পনার ওপর।

শুধু সৌন্দর্য নয়, গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিবেশব্যবস্থা

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সকে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্বের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।

ইউনেসকোর মতে, ৮৭ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপত্যকার আলপাইন উদ্ভিদবৈচিত্র্য আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম হিমালয়ের উদ্ভিদভূমির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ এখানে দেখা যায়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি জাস্কার ও গ্রেট হিমালয় পর্বতশ্রেণির মধ্যবর্তী রূপান্তর অঞ্চলের অংশ। এখানে এমন কিছু উদ্ভিদ প্রজাতিও রয়েছে, যেগুলোর দেখা মেলে না উত্তরাখণ্ডের অন্য কোথাও। 

দুর্গম অবস্থান ও সীমিত প্রবেশাধিকারও এই বাস্তুতন্ত্রকে তুলনামূলকভাবে অক্ষত রাখতে সাহায্য করেছে। ইউনেসকো বলছে, ১৯৮৩ সালের পর থেকে এই অঞ্চলে মানুষের চাপ খুবই সীমিত ছিল; নিয়ন্ত্রিত কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন ছাড়া বড় ধরনের মানবিক হস্তক্ষেপ হয়নি।

এই কারণেই ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখার বিষয় নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩ হাজার ৫০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় এটি এমন একটি সংবেদনশীল পাহাড়ি প্রতিবেশব্যবস্থা, যেখানে পর্যটন ও সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হিমালয়ের জীবন্ত গালিচা

ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সের সবচেয়ে বড় বিস্ময় হয়তো এর স্থায়িত্বহীন সৌন্দর্য।

এখানে ফুল ফুটে থাকে না সারা বছর। বরফ গলে, বর্ষা আসে, পাহাড়ি মাটিতে একের পর এক ফুল ফুটতে শুরু করে। কয়েক সপ্তাহের জন্য রুক্ষ পাহাড়ের বুক হয়ে ওঠে রঙিন। তারপর ধীরে ধীরে মৌসুম শেষ হয়। ফুল শুকিয়ে যায়, তাপমাত্রা কমে আসে, আর তুষার আবার ঢেকে দেয় উপত্যকাকে।

এই ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যই ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সকে অন্যরকম করে তুলেছে।

এটি কোনো সাজানো বাগান নয়, কোনো পরিকল্পিত উদ্যানও নয়। হিমালয়ের নিজস্ব ছন্দে গড়ে ওঠা এক আলপাইন তৃণভূমি—যেখানে প্রকৃতি নিজের নিয়মেই রং বদলায়।

হয়তো সে কারণেই ভ্যালি অব ফ্লাওয়ার্সে যাওয়া মানে শুধু একটি সুন্দর জায়গা দেখা নয়। বরং এমন এক প্রাকৃতিক মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া, যা কয়েক সপ্তাহ পরই আবার পাহাড়ি কুয়াশা, শীত আর তুষারের আড়ালে হারিয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: ফার্স্টপোস্ট; ইউনেসকো; উত্তরাখণ্ড পর্যটন দপ্তর