চার হিমবাহ হ্রদের পানি কমাবে নেপাল, ঝুঁকি কাটবে?

The_Barun_glacial_lake_in_the_Makalu_region.jpg
নেপালের মাকালু অঞ্চলের বারুন হিমবাহ হ্রদ। ছবি: আইসিআইএমওডি/ইউএনডিপি

গত ২৬ আগস্ট ভোতেকোশি অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় যে মাত্রায় প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তার পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলার মধ্যেই ধারাবাহিক এই দুর্যোগ একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে—নেপাল তার বাকি পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তায় কী করছে?

বর্তমানে এর উত্তর হলো, কোশি ও গান্ডাকি অববাহিকার চারটি হিমবাহ হ্রদের পানির উচ্চতা কমাতে প্রায় ৫ কোটি মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। তবে এসব হ্রদ নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে যেভাবে কাজটির পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে হ্রদের ভাটির দিকে বসবাসকারী জনপদগুলো পুরোপুরি নিরাপদ হবে না।

সোলুখুম্বুর লুমডিং সো ও হোঙ্গু-২, সঙ্খুয়াসভার লোয়ার বারুন এবং মানাংয়ের থুলাগি (দোনা)—এই চারটি হ্রদকে ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। ওই প্রতিবেদনে নেপাল, তিব্বত ও ভারতজুড়ে ৪৭টি হিমবাহ হ্রদে আকস্মিক পানি নির্গমনের উচ্চঝুঁকি থাকার কথা বলা হয়। এগুলোর মধ্যে ২১টি নেপালে। এর মধ্যে আটটিকে নতুন করে চিহ্নিত করা হয় এবং বাকি ১৩টিকে ২০১১ সালের প্রতিবেদনেও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল।

নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত দুটির পানির উচ্চতা কমানো হয়েছে। ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার পর বাকি হ্রদগুলোর বিষয়ে দেশটি কী করবে, সেই প্রশ্নটি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে।

দেশটির পাহাড়ি অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তন, ভূমিকম্প ও ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সম্মিলিত ঝুঁকির মুখে রয়েছে। হিমবাহ সংকুচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক জায়গায় নতুন হ্রদ তৈরি হচ্ছে এবং বিদ্যমান হ্রদগুলো বড় হচ্ছে। এসব হ্রদ থেকে আকস্মিক পানি বেরিয়ে গেলে গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা জিএলওএফের সৃষ্টি হতে পারে।

প্রায় ৫ কোটি ডলারের প্রকল্প

‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বন্যায় নেপালের হিমবাহ নদী অববাহিকায় ঝুঁকিতে থাকা জীবিকা ও সম্পদ সুরক্ষা’—প্রকল্পটি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের আওতাধীন গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলারের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। সরকার ও অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার সংগ্রহ করবে।

নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগ (ডিএইচএম) ইউএনডিপি’র সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বিভাগটির হিসাবে, পাহাড়ি এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা প্রায় ২৩ লাখ মানুষ এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হবে।

নেপাল সরকার উদ্যোগটির নাম দিয়েছে ‘জিএলওএফ সঞ্জীবনী প্রকল্প’। এর জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক রাজন ভট্টরাই বলেন, এ বছরের কাজের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এ বছর নির্মাণকাজ শুরু হবে না। আমরা আগে সংশোধিত নকশা চূড়ান্ত করব।”

চারটি হ্রদের পানি কতটা কমানো হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভট্টরাই বলেন, এ নিয়ে এখনো সমীক্ষা হয়নি। তিনি বলেন, ‘এটি সম্ভবত সো রোলপা ও ইমজায় যা করা হয়েছিল, তার কাছাকাছি হবে।’

বিজ্ঞানীদের আপত্তির মূল জায়গাটিই হলো এই উত্তর।

তিন মিটারের মানদণ্ড

দোলাখার সো রোলপা ছিল নেপালের প্রথম হিমবাহ হ্রদ, যার পানির উচ্চতা ২০০০ সালে তিন মিটার কমানো হয়। এরপর ২০১৬ সালে সোলুখুম্বুর খুম্বু অঞ্চলের ইমজা হৃদের পানির উচ্চতা প্রায় ৩ দশমিক ৪ মিটার কমানো হয়। দুটি ক্ষেত্রেই কতটা পানি কমানো হবে, তা জলবিদ্যার ভিত্তিতে নয়, বরং বাজেটের সীমাবদ্ধতার মধ্যেই নির্ধারিত হয়েছিল।

নেপালের হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ নিয়ে কয়েক দশক ধরে গবেষণা করা পর্বত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আলটন সি. বায়ার্স বলেন, তিন মিটার কমানোর ধারণাটি সো রোলপাকে ভিত্তি করে তৈরি এবং তা যথেষ্ট নয়।

‘সো রোলপায় মূল পরিকল্পনা ছিল সর্বোচ্চ ২০ মিটার পর্যন্ত পানি কমানো। কিন্তু বাজেটের কারণে তিন মিটারেই কাজ থেমে যায়,’ বলেন তিনি।

বায়ার্সের ভাষ্য, সো রোলপাকে মানদণ্ড ধরে ইমজার পানিও মাত্র তিন মিটার কমানো হয়েছিল।

ইমজা, লোয়ার বারুন ও থুলাগি নিয়ে গবেষণা করা যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জেফরি এস. কার্গেল বলেন, ইমজার পানির উচ্চতা অন্তত ১০ মিটার কমানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যয়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

তার ভাষ্য, ‘সম্পদ সীমিত হলে প্রকৌশলগতভাবে পানির উচ্চতা কমানোর কাজকে বিদ্যমান বাজেটের মধ্যেই করতে হয়। তাই যা আছে, তা দিয়েই যতটা সম্ভব ভালো কাজ করতে হয়।’

নেপালের জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগের বন্যা পূর্বাভাস শাখার প্রধান বিনোদ পারাজুলি বলেন, বিজ্ঞানীরা ইমজার পানির উচ্চতা অন্তত ২০ মিটার কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাজেট তা করতে দেয়নি।

তবু এ কাজের ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন পারাজুলি। তিনি বলেন, ‘(পানি) সামান্য কমানোও প্রাকৃতিকভাবে হ্রদ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। এত বড় একটি এলাকায় কয়েক মিটার পানিও কমিয়ে ফেলা মোটেও কোনো ছোট কাজ নয়।’

কাজটি ব্যয়বহুল হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল এর বাস্তব জটিলতা। এ প্রসঙ্গে পারাজুলি বলেন, বুলডোজারসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি হেলিকপ্টারে করে ইমজায় নিয়ে যেতে হয়েছিল। কাজের জন্য প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হলে খুব কম সাড়া পাওয়া যায়। পরপর তিনবার দরপত্র ব্যর্থ হওয়ার পর কাজটি নেপালি সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ঠিকাদাররা মোটেই আগ্রহ দেখাননি। যারা আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই অত্যন্ত বড় অঙ্কের অর্থ চেয়েছিলেন। এত অর্থ সেখানে ছিল না।’

নেপালে হ্রদের পানির উচ্চতা কমানোর কাজ ইতিমধ্যে অত্যন্ত জটিল, কঠিন ও ব্যয়বহুল বলে প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন বায়ার্স। তিনি জানান, পেরুর কর্দিয়েরা ব্লাঙ্কা অঞ্চলে ১৯৫০-এর দশক থেকে ১৯৭০-এর দশকের মধ্যে প্রায় ৩১টি ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদের পানির উচ্চতা কমানো হয়েছিল।

তবে বায়ার্সের যুক্তি, খরচ বেশি—এটি এমন কোনো মাত্রা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করার কারণ হতে পারে না, যা বাস্তবে ঝুঁকি কমাতে পারবে না।

তিনি বলেন, ‘জিসিএফের অর্থায়নে হ্রদের পানির উচ্চতা কমানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে এর ভিত্তি অবশ্যই শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর হতে হবে এবং ঝুঁকি বাস্তবে কমানোর মতো পর্যাপ্ত মাত্রায় পানি কমাতে হবে। তা না হলে এই কাজ তহবিলের অপব্যবহার বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে পরিণত হবে। পেরুর অভিজ্ঞতা থেকে শেখার অনেক কিছু আছে।’

ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেন্টার ফর ওয়াটার রিসোর্সেস স্টাডিজের পোস্টডক্টরাল গবেষক নিতেশ খাডকা একটি নির্দিষ্ট সীমার কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘একটি হ্রদের পানি দুই বা চার মিটার কমাতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করলে খুব সামান্যই অর্জন হয়। এতে ভাটির দিকে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। হ্রদের পানি কমাতে হলে তা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমাতে হবে—যাতে ভাটির দিকে অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধ করা যায়।’

প্রতিটি হ্রদের ক্ষেত্রে আলাদা সমীক্ষা করে কতটা পানি কমানো প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে বলে মনে করেন বায়ার্স। তার মতে, নেপালের সম্ভাব্য বিপজ্জনক ২১টি হিমবাহ হ্রদ নিয়ে নতুন করে স্যাটেলাইট ও রিমোট সেন্সিং, মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন, গভীরতা পরিমাপ এবং আয়তন নিরূপণ করতে হবে। এরপর কম, মাঝারি ও বেশি মাত্রার পানি প্রবাহে কী ধরনের বন্যা হতে পারে, তার মডেল তৈরি করতে হবে। তারপর উপযুক্ত ব্যবস্থা বেছে নিতে হবে—হ্রদের পানি কমানো, প্রান্তিক মোরেইন বাঁধ শক্তিশালী করা অথবা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা স্থাপন।

পানি কমানোই পুরো কাজ নয়

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সো রোলপা বা ইমজা কোনোটিই এখন পুরোপুরি নিরাপদ নয়। কারণ ঝুঁকি শুধু হ্রদের পানির গভীরতার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।

কার্গেল বলেন, হ্রদ থেকে পানি বের হওয়ার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন। প্রবাহ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এটি সহায়তা করে। মোরেইনের (হিমবাহের সঙ্গে আসা বা চারপাশে জমে থাকা পাথর, নুড়ি, বালি, কাদা ও অন্যান্য শিলাখণ্ডের স্তূপ) ভেতরে বরফ থাকলে এবং সেই বরফ গলে গেলে হ্রদের বহির্গমনপথ স্বাভাবিকভাবেই নিচের দিকে সরে যেতে পারে। এ সময়ও প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কাজে আসে। ইমজায় এ ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ইমজা হ্রদের পানির উচ্চতা কমাতে নির্মিত কৃত্রিম উন্মুক্ত খাল। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্ট

কার্গেলের মতে, সো রোলপায় পানি বের হওয়ার কাঠামো স্থিতিশীল করা এবং পানির উচ্চতা তিন মিটার কমানোর কাজ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

তবে হ্রদের ভাটির দিকে বড় ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন কার্গেল। তিনি বলেন, ‘পানি কমানোর পাশাপাশি ঝুঁকির মুখে থাকা জনগোষ্ঠী ও অবকাঠামোর ঝুঁকিপ্রবণতা কমাতে হবে। হিমবাহ থেকে বন্যার সম্ভাব্য পথে অবকাঠামো নির্মাণের সময় অনেক বেশি সতর্কতার সঙ্গে চিন্তা করতে হবে। দামি অবকাঠামো নির্মাণ করে তা বন্যায় ধ্বংস হওয়ার পর আবার নির্মাণ করে আবারও ধ্বংস হতে দেখার কোনো মানে হয় না। আমার মতে, নেপাল ও ভারতের কিছু উপত্যকায় এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্কতা নেওয়া হয়নি।’

কার্গেলের অভিমত, জলবিদ্যুৎ বিনিয়োগকারীদের উচ্চঝুঁকির স্থান এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া উচিত।

পারাজুলিও অগ্রাধিকার নির্ধারণের বিষয়ে একমত। তিনি বলেন, কোনো হিমবাহ থেকে বরফধস হ্রদে আঘাত করলে পানি কতটা কমানো হয়েছে, তা বিপদ পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

‘হ্রদের পানি কমালে ক্ষয়ক্ষতি কমে, কিন্তু কতটা কমাতে হবে তা অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে—কত বাজেট আছে, ভূখণ্ড কেমন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। আর এসব হ্রদের অনেকগুলোকে মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।

ছোট হ্রদও ঝুঁকির বাইরে নয়

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ বিশেষজ্ঞ রিজন ভক্ত কৈস্থ বলেন, শুধু বড় হ্রদগুলোই বিপজ্জনক—এমন ধারণা ভুল।

তার ভাষ্য, ‘হ্রদের পানি কমানো আর ঝুঁকি দূর করা এক বিষয় নয়। নেপালে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর অধিকাংশ নিয়েই এখনো গবেষণা করা হয়নি।’

খাডকাও তালিকাটির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আইসিএমওডি নিজস্ব পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ২১টি হ্রদকে বিপজ্জনক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এটিই চূড়ান্ত কথা নয়। বিভিন্ন পিয়ার-রিভিউ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালের আরও শত শত হ্রদ ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্য হ্রদগুলোকেও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আওতায় রাখতে হবে।’

হ্রদের আকারও ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য নির্দেশক নয় বলে মনে করেন বায়ার্স। তিনি লাংমালে হ্রদ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার উদাহরণ টেনে বলেন, হ্রদটির আয়তন শূন্য দশমিক ০১ বর্গকিলোমিটারেরও কম। কিন্তু ২০১৭ সালে বারুন উপত্যকায় সালদিম চূড়া থেকে প্রায় ১১ লাখ ঘনমিটার বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ হ্রদটিতে পড়ে বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টি করেছিল।

নতুন প্রকল্পের আওতায় আইসিআইএমওডি ও ইউএনডিপি চিহ্নিত হ্রদের বাইরের হ্রদগুলোর ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে জানান ভট্টরাই।

তিনি বলেন, ‘শুধু বড় হ্রদ নয়—ছোট হ্রদও ঝুঁকিপূর্ণ। চলতি বছরের মধ্যে সব হিমবাহ হ্রদের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে বলা হয়েছে।’

তবে এসব হ্রদ নিয়ে গবেষণা করাটিও বড় বাধা বলে মানছেন খাডকা। তার মতে, বিষয়টি শুধু পানি কমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

খাডকা বলেন, ‘পরিবেশগত ও ভৌগোলিক কারণে এসব হ্রদ নিয়ে গবেষণা করা কঠিন। রিমোট সেন্সিংয়ের বদলে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করতে পারলে আমরা আরও কার্যকরভাবে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা নিতে পারব।’

পুরোনো তথ্যের ওপর তৈরি মূল্যায়ন

পুরোনো প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা এখন আর যথেষ্ট হবে না বলে মনে করেন কার্গেল।

তিনি বলেন, ‘বিপদ ও ঝুঁকি মূল্যায়নগুলো পুরোনো হয়ে গেছে। বর্তমানে যে ঘটনাগুলো ঘটছে, সেগুলোর ভিত্তিতে এগুলো সংশোধন করতে হবে। জটিল ঘটনাগুলো থেকে কীভাবে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যায়, সেটিও আমাদের বের করতে হবে। হালনাগাদ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সরকারি নীতি, আর্থিক বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা—সবকিছুতেই পরিবর্তন আনতে হবে।’

তিনি বলেন, ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয়ের সঙ্গে ভোতেকোশি বন্যার বেশ মিল রয়েছে। ওই বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে বরফধস ও পাথরধস থেকে সৃষ্ট বন্যায় ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়।

মানাং উপত্যকার গঙ্গাপূর্ণা হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদ। ছবি: কাঠমান্ডু পোস্ট

বিজ্ঞানীদেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে কার্গেল বলেন, ‘২৬ আগস্টের ঘটনা, ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলি বিপর্যয় এবং ২০১২ সালে নেপালের সেতি বন্যা—সবগুলোই দেখায় যে ঝুঁকি বাড়ছে। এসব ঘটনার পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের এসব জটিল ঘটনার পেছনের প্রক্রিয়া এবং এগুলো থেকে তৈরি ঝুঁকি কীভাবে মূল্যায়ন করা যায়, তা আমাদের বর্তমান সক্ষমতার তুলনায় অনেক ভালোভাবে বুঝতে হবে।’

ভোতেকোশি–ত্রিশূলি দুর্যোগ নিয়ে তৈরি ‘র‌্যাপিড সিচুয়েশন অ্যানালাইসিস রিপোর্ট: ত্রিশূলি ক্যাটাসট্রফিক ফ্লাড’-এও একই ধরনের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঝুঁকি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা তৈরি করতে জলবায়ুবিজ্ঞান, হিমবিজ্ঞান, ভূতত্ত্ব, জলবিদ্যা, আবহাওয়াবিজ্ঞান এবং নদীবিজ্ঞানের জ্ঞানকে একত্র করতে হবে।

মোহন বাহাদুর চাঁদ, অধ্যাপক কৈস্থ ও সনৎ অধিকারীসহ গবেষকদের তৈরি প্রতিবেদনে বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

‘ভোতেকোশি বন্যা দেখিয়েছে, গবেষণার ক্ষেত্রে এখনো কতটা কাজ বাকি’ উল্লেখ করে কৈস্থ বলেন, ‘আপনি নিজেকে একটি গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না যে শুধু হিমবাহ হ্রদই ঝুঁকি তৈরি করে। হিমবাহগুলোও সমানভাবে বিপজ্জনক। ঝুঁকি মূল্যায়নে আরও অনেক বেশি গবেষণা প্রয়োজন।’

চারটি হিমবাহ হ্রদের পানি কমানোর প্রকল্প তাই নেপালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু পানি কমিয়ে ঝুঁকি শেষ হবে না। কোন হ্রদে কতটা পানি কমাতে হবে, কোথায় বহির্গমনপথ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কোথায় আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা বসাতে হবে এবং সম্ভাব্য বন্যার পথে কোথায় কী ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা নিরাপদ—এসব প্রশ্নের উত্তরও একই সঙ্গে খুঁজতে হবে।

•    লেখক: উপেন্দ্র রাজ পান্ডে, সাংবাদিক
      দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত