বারনই নদীর কান্না: মাছের মড়কের নেপথ্যে কী

বারনই নদীর কান্না: মাছের মড়কের নেপথ্যে কী

৪ সেপ্টেম্বরের বিকেল।

নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পর্যন্ত বারনই নদীর তীরে সেদিনের দৃশ্য অন্য রকম। নদীর পানিতে ভাসছে মাছ। পুঁটি, টেংরা, বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের অনেকগুলো ছিল নিথর, কিছু আবার শেষ শক্তিটুকু দিয়ে পানিতে ছটফট করছে।

নদীর পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কারও হাতে জাল, কেউ খালি হাতেই পানিতে নেমেছেন। মরা-আধমরা মাছ সংগ্রহ করছেন অনেকে।

দূর থেকে দৃশ্যটিকে মাছ ধরার উৎসব মনে হতে পারে। কিন্তু নদীর কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি কোনো উৎসব নয়—এটি একটি নদীর অসুস্থ হয়ে পড়ার দৃশ্য।

স্থানীয় মানুষের ভাষ্য, অস্বাভাবিকতার শুরু হয়েছিল আরও আগে। বৃহস্পতিবার রাত (৪ সেপ্টেম্ব) থেকেই নদীর পানিতে দুর্গন্ধ ও অস্বাভাবিক বুদ্‌বুদ দেখা যাচ্ছিল। পরদিন মাছ ভেসে উঠতে শুরু করলে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক।

প্রশ্ন উঠে—হঠাৎ কী হলো বারনইয়ের?

পানির নিচে কী ঘটেছিল?

একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা সাধারণত পানির পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে মাছ শ্বাস নিতে পারে না। আবার বিষাক্ত রাসায়নিক, অতিরিক্ত জৈব বর্জ্য কিংবা পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের আকস্মিক পরিবর্তনও মাছের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

বারনইয়ের ক্ষেত্রেও এমন একাধিক সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

বর্তমানে পাট পচনের বর্জ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য এবং নগর ও পোলট্রি বর্জ্যকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু পরীক্ষাগারে পানি ও মাছের নমুনা বিশ্লেষণের আগে এর কোনো একটিকে মাছের মৃত্যুর নিশ্চিত কারণ বলা যাচ্ছে না।

পাট জাগের পানিতে অক্সিজেন কমে যেতে পারে

বর্ষাকালে নদী ও জলাশয়ের আশপাশে পাট জাগ দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশে পরিচিত। কিন্তু বিপুল পরিমাণ পাট দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে সেখানে তৈরি হয় বড় পরিমাণ জৈব পদার্থ।

পাটের আঁশ ছাড়ানোর পর পানিতে থাকা জৈব উপাদান পচতে শুরু করে। এই জৈব পদার্থ ভাঙতে অণুজীব অক্সিজেন ব্যবহার করে। ফলে পানির বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড বা বিওডি বেড়ে যেতে পারে এবং কমে যেতে পারে দ্রবীভূত অক্সিজেন।

অক্সিজেনের মাত্রা খুব নিচে নেমে গেলে মাছের জন্য পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তৈরি হতে পারে হাইপোক্সিয়া—অর্থাৎ পানিতে অক্সিজেনের এমন ঘাটতি, যাতে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যাহত হয়।

বারনইয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, সেটি পরীক্ষার ফল ছাড়া বলা যাবে না। কিন্তু স্থানীয় কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য কারণের তালিকায় পাট পচনের বিষয়টি রয়েছে।

বারনই নদী রাজশাহী ও নাটোরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি নদী। শিব নদী থেকে এর প্রবাহ শুরু হয়ে নাটোরের সিংড়া এলাকায় আত্রাই নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। একসময় নৌযান ও কৃষিপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ এই নদী বর্তমানে নাব্যতা সংকট ও দূষণের চাপে রয়েছে।

বৃষ্টির পানির সঙ্গে নদীতে ঢুকছে কী?

আরেকটি প্রশ্ন নদীতে আসা বর্জ্য নিয়ে।

সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টির সময় আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য ও দূষিত পানি নদীতে গিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর মধ্যে রয়েছে নগর এলাকার বর্জ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য এবং পোলট্রি খামারের জৈব বর্জ্য।

পচনশীল এসব বর্জ্য নদীর পানিতে গেলে সেখানে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বদলে যেতে পারে।

পানির ওপর দেখা দেওয়া বুদ্‌বুদও স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জৈব পদার্থ পচনের সময় বিভিন্ন গ্যাস তৈরি হতে পারে। তবে বারনইয়ের পানিতে দেখা দেওয়া বুদ্‌বুদের নির্দিষ্ট রাসায়নিক গঠন কী ছিল, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

বারনইয়ের পানি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন

এবারের ঘটনা হঠাৎ চোখে পড়লেও বারনই নদীর পরিবেশগত সংকট নতুন নয়।

২০১৮ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বারনই নদীতে অপরিশোধিত বর্জ্যপানি প্রবাহের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছিল। গবেষণায় দেখা যায়, বর্জ্যপানি প্রবেশের পর নদীর প্রভাবিত অংশে মাছের প্রাচুর্য ও প্রজাতিসমৃদ্ধি কমে যায়।

অর্থাৎ নদীর ওপর বর্জ্যের চাপ শুধু পানির রং বা গন্ধের পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘমেয়াদে তা নদীর জীববৈচিত্র্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

আরেকটি গবেষণায় বারনই নদীর পানিতে ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন দূষকের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে এসব পুরোনো গবেষণার ফল দিয়ে ২০২৬ সালের এই মাছের মড়কের সরাসরি কারণ নির্ধারণ করা যাবে না। বর্তমান ঘটনার জন্য প্রয়োজন বর্তমান সময়ের পানি ও মাছের নমুনা বিশ্লেষণ।

‘পানিত খুব গন্ধ’

নদীর পানি নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা যাদের, তারা হলেন জেলে ও নদীনির্ভর মানুষ।

নলডাঙ্গার বাশিলা গ্রামের জেলে ভবেশ চন্দ্র কয়েক দিন ধরে নদীতে নামতে পারছেন না। পানির দুর্গন্ধের পাশাপাশি গায়ে পানি লাগলে চুলকানি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তার ভাষায়, ‘কয়দিন ধরি নদীত নামি মাছ ধরতে পারছিনি। পানিত খুব গন্ধ। পানি গায়ে লাগলে চুলকাচ্ছে। মাছও মরছে।’

নৌকার মাঝি হবিবর রহমানের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। নদীর পানি ব্যবহার করা নিয়েও স্থানীয় মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে ভয়।

এই অভিজ্ঞতাগুলো নদীর পানি নিয়ে উদ্বেগের কারণ হলেও নির্দিষ্ট দূষকের কারণে ত্বকে এমন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

নদীর মাছ—খাবার, না কি ঝুঁকি?

মাছ ভেসে উঠতেই অনেক মানুষ সেগুলো সংগ্রহ করেছেন। কারও কাছে এটি সহজে পাওয়া খাবার, কারও কাছে কয়েক দিনের বাজার খরচ বাঁচানোর সুযোগ।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন—যে মাছ কেন মারা গেল, তার কারণ না জেনে সেই মাছ খাওয়া কতটা নিরাপদ?

মাছের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিক, ক্ষতিকর জীবাণু বা অন্য কোনো দূষক আছে কি না, সেটিও জানা যায়নি।

তাই পরীক্ষার ফল ও কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মরা বা অসুস্থ অবস্থায় ভেসে ওঠা মাছ না খাওয়াই সতর্কতার পথ।

কারণ মাছটি যদি কেবল অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়ে থাকে, পরিস্থিতি এক রকম। আর যদি পানিতে কোনো বিষাক্ত রাসায়নিক বা দূষক থাকে, তাহলে ঝুঁকির ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যখন নদীর পাহারাদারদের হাতেই নেই পরীক্ষার সরঞ্জাম!

বারনইয়ের এই ঘটনায় আরেকটি বিষয় সামনে এসেছে—নদীর পানি পরীক্ষা ও তাৎক্ষণিক পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।

ঘটনার পর পানি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। জেলা মৎস্য বিভাগ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। চারটি স্থান থেকে পানি ও মৃত মাছের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষা হলো—পরীক্ষার ফল কী বলছে?

কারণ অনুমান দিয়ে নদী বাঁচানো যায় না।

কোন দূষক আছে, তার ঘনত্ব কত, পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কত, pH কত এবং মাছের শরীরে ক্ষতিকর কোনো রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে কি না—এসব তথ্য ছাড়া দূষণের উৎস শনাক্ত করা কঠিন।

এই ঘটনা আগেও ঘটেছে

বারনই নদীতে মাছের মড়ক এবারই প্রথম নয়। ২০২২ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তখন পাট জাগ থেকে তৈরি দূষণ এবং পানিতে অক্সিজেন কমে যাওয়াকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কয়েক বছর পর আবারও যদি একই ধরনের দৃশ্য ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্নটি শুধু ‘এবার মাছ কেন মরল?’-এ আটকে থাকার কথা নয়।

প্রশ্ন হওয়া উচিত—বারবার এমন ঘটনা ঘটছে কেন?

কোন কোন খাল বা নালা দিয়ে বর্জ্য নদীতে ঢুকছে? পাট জাগের জায়গাগুলো কোথায়? শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা হচ্ছে? পোলট্রি খামারের বর্জ্য কোথায় যাচ্ছে? নদীর পানির মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কি?

এসব প্রশ্নের উত্তর না মিললে প্রতিবার মাছ মরার পর নমুনা সংগ্রহ আর সতর্কতা জারি করেই সংকটের সমাধান হবে না।

একটি নদী শুধু তার পানির নাম নয়

বারনই নদীর গল্প আসলে মাছের গল্পের চেয়ে বড়।

একটি নদীতে মাছ থাকে, জলজ উদ্ভিদ থাকে, অণুজীব থাকে। সেই নদীর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জেলে, কৃষক, নৌকার মাঝি এবং নদীতীরের মানুষের জীবন-জীবিকা। নদীর পানি দূষিত হলে ক্ষতিটা তাই শুধু পানির মধ্যে আটকে থাকে না।

প্রথমে হয়তো ভেসে ওঠে কয়েকটি মাছ।

তারপর কমে যায় দেশীয় প্রজাতির সংখ্যা। বদলে যায় জলজ বাস্তুতন্ত্র। নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ে। আর দীর্ঘদিনের দূষণ একসময় নদীটিকে এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

বারনইয়ের তীরে মরা মাছগুলো তাই কেবল একটি দিনের দৃশ্য নয়।

এগুলো হয়তো একটি দীর্ঘদিনের সমস্যার দৃশ্যমান সংকেত।

কান্নাটা থামবে কীভাবে?

এখন প্রথম কাজ—মাছের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা। এরপর সেই কারণ যদি দূষণ হয়, তবে দূষণের উৎস শনাক্ত করে তা বন্ধ করতে হবে।

নদীর পানির মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, শিল্প ও নগর বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, পাট জাগের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ—সবগুলোকে একই ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে।

শুধু একটি মাছের মড়কের পর ব্যবস্থা নিলে হবে না। দরকার এমন একটি নজরদারি ব্যবস্থা, যাতে পানির মান বিপজ্জনক পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা যায়।

কারণ নদী সাধারণত একদিনে মরে না।

অনেক দিন ধরে তার শরীরে জমতে থাকে দূষণ, অব্যবস্থাপনা আর অবহেলা। তারপর কোনো এক বর্ষার বিকেলে তীরে ভেসে ওঠে সেই মৃত্যুর চিহ্ন।

বারনইয়ের তীরে এবার সেই চিহ্নই দেখা গেছে।

প্রশ্ন এখন একটাই—আমরা কি শুধু মরা মাছগুলো তুলে নেব, নাকি যে কারণে মাছগুলো মরছে, সেই কারণটাকেও নদী থেকে তুলে ফেলব?