প্রায় ৯ বছর ধরে অপেক্ষায় থাকা দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার উন্মোচনের তারিখ চূড়ান্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা টেসলা। প্রতিষ্ঠানটির ঘোষণা অনুযায়ী, আসছে ১ অক্টোবর নতুন রোডস্টার উন্মোচন করা হবে।
১২ সেপ্টেম্বর টেসলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ‘গো ফর লঞ্চ’ ‘Go for launch’ বার্তাসহ একটি টিজার প্রকাশ করে। সেখানে ‘10.01’ লেখা ছিল। একই সময় কোম্পানির রোডস্টার ওয়েবপেজে উন্মোচনের কাউন্টডাউনও চালু হয়। পরবর্তী সময়ে রিজার্ভেশনধারীদের পাঠানো আমন্ত্রণপত্রে অনুষ্ঠানটি টেক্সাসের ওয়াকোতে হওয়ার তথ্য সামনে আসে।
টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কও নতুন রোডস্টার নিয়ে প্রত্যাশা বাড়িয়ে চলেছেন। প্রযুক্তি সংবাদের বিভিন্ন সাইটের প্রতিবেদনে তার সাম্প্রতিক প্রচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই সব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা প্রকল্পটির ক্ষেত্রে এবার ঘোষিত উন্মোচন বাস্তবে রূপ নেয় কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রোডস্টারে কি সত্যিই থাকবে ‘উড্ডয়ন’ প্রযুক্তি?
নতুন রোডস্টারকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আগ্রহ তৈরি হয়েছে গাড়িটির সম্ভাব্য ‘কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার’ নিয়ে।
টেসলার প্রকাশিত টিজারে গাড়ির পেছন দিক থেকে থ্রাস্টারের মতো সাদা গ্যাস নির্গমনের ইঙ্গিত দেখা যায়। এর সঙ্গে স্পেসএক্সের প্রযুক্তির সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। দ্য ইনফরমেশন-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেসএক্স-ব্র্যান্ডেড একটি বিশেষ সংস্করণের রোডস্টারে কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে মাটি থেকে তোলার প্রদর্শনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ হয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, টেসলা এখনো প্রকাশ্যে বিস্তারিতভাবে জানায়নি যে উৎপাদন পর্যায়ের গাড়িতে এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করবে। তাই ‘উড়ন্ত গাড়ি’ হিসেবে রোডস্টারকে বর্ণনা করার বদলে ‘মাটি থেকে তোলার সম্ভাব্য থ্রাস্টার প্রযুক্তি’ হিসেবে বিষয়টি উপস্থাপন করাই যথাযথ।
২০১৭ সালের প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হবে?
দ্বিতীয় প্রজন্মের রোডস্টার প্রথমবার উন্মোচন করা হয়েছিল নভেম্বর ২০১৭-তে। তখন টেসলা গাড়িটির গতি ও দূরত্বের সক্ষমতা নিয়ে বেশ উচ্চাভিলাষী দাবি করেছিল।
তৎকালীন ঘোষণায় বলা হয়েছিল, গাড়িটি দুই সেকেন্ডের কম সময়ে ঘণ্টায় শূন্য থেকে ৬০ মাইল গতিতে পৌঁছাতে পারবে। সর্বোচ্চ গতি হবে ঘণ্টায় ২৫০ মাইলের বেশি। একবার চার্জে গাড়িটি ৬০০ মাইলের বেশি পথ চলতে পারবে বলেও দাবি করেছিল কোম্পানিটি।
প্রাথমিকভাবে রোডস্টারের বেস মডেলের মূল্য ২ লাখ ডলার এবং ‘ফাউন্ডারস সিরিজ (Founders Series)’-এর মূল্য আড়াই লাখ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে এগুলো ২০১৭ সালে ঘোষিত মূল্য; নতুন সংস্করণের চূড়ান্ত মূল্য ও স্পেসিফিকেশন এখন আলাদাভাবে নিশ্চিত হওয়া দরকার।
দীর্ঘ বিলম্বের কারণে আগাম বুকিং দেওয়া কিছু গ্রাহকও পরে সরে গেছেন। প্রতিবেদনে ৫০ হাজার ডলার অগ্রিম বুকিং দেওয়া গ্রাহকদের মধ্যে ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং প্রযুক্তিবিষয়ক ইউটিউবার মার্কেস ব্রাউনলির নামও এসেছে।
পুরোনো নকশা বদলে নতুন রোডস্টার
রোডস্টারের প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। দ্য ইনফরমেশনের-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে দেখানো নকশাটি বাদ দিয়ে নতুন নকশায় গাড়িটি তৈরি করা হচ্ছে।
ফলে ১ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে শুধু পুরোনো রোডস্টারের উন্নত সংস্করণ নয়, বরং টেসলার নতুন নকশা ও প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার বড় অংশই সামনে আসতে পারে।
তবে উন্মোচনের পর গাড়িটি কবে থেকে নিয়মিত উৎপাদনে যাবে, সে প্রশ্ন এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। মাস্কের আগের বক্তব্য অনুযায়ী, উন্মোচনের পরও উৎপাদনে যেতে ১২ থেকে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে।
পরিবেশের দিক থেকে কী বলছে এই গাড়ি?
রোডস্টার একটি অল-ইলেকট্রিক স্পোর্টসকার। ফলে এতে প্রচলিত অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের বদলে বৈদ্যুতিক ড্রাইভ ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা রয়েছে। টেসলা নিজেও রোডস্টারকে অল-ইলেকট্রিক স্পোর্টসকার হিসেবে উপস্থাপন করে।
তবে শুধু বৈদ্যুতিক হওয়াকে ভিত্তি করে নতুন রোডস্টারের সামগ্রিক পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে যাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাটারি উৎপাদন, কাঁচামাল, গাড়ির জীবনচক্র এবং সম্ভাব্য থ্রাস্টার ব্যবস্থার পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক বিশ্লেষণ মেলেনি।
তাই আপাতত রোডস্টারের পরিবেশগত গুরুত্বের চেয়ে এর বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রযুক্তি ও উচ্চক্ষমতার প্রকৌশলগত সক্ষমতাই বেশি নিশ্চিতভাবে আলোচনার বিষয়।
১ অক্টোবরের অপেক্ষায় প্রযুক্তি বিশ্ব
২০১৭ সালে ঘোষণার পর থেকে রোডস্টারকে ঘিরে একাধিক সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। এবার টেসলা আনুষ্ঠানিকভাবে ১ অক্টোবরের তারিখ সামনে এনেছে এবং উন্মোচনের কাউন্টডাউনও চালু করেছে।
ফলে এবারের অনুষ্ঠানটি শুধু একটি নতুন গাড়ির উন্মোচন নয়; প্রায় এক দশক ধরে চলা রোডস্টার প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়েছে, সেটিও যাচাইয়ের সুযোগ দেবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে—টেসলা কি এবার ২০১৭ সালের প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তব উৎপাদনযোগ্য গাড়িতে রূপ দিতে পারবে, নাকি ১ অক্টোবরও থাকবে মূলত প্রযুক্তির প্রদর্শনী ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মঞ্চ?