নদী শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পানি বয়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ নয়। একে ঘিরে গড়ে ওঠে জনপদ, কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও সংস্কৃতি। একটি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে গেলে তার প্রভাব পড়ে তীরবর্তী মানুষের জীবন থেকে শুরু করে পুরো নদী অববাহিকার পরিবেশ ও অর্থনীতিতে।
প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার ‘বিশ্ব নদী দিবস’ পালিত হয়। চলতি বছর দিবসটি পড়েছে ২৭ সেপ্টেম্বর। বিশ্বজুড়ে নদীর গুরুত্ব তুলে ধরা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নদীর উন্নত ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণে মানুষের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
এবারের প্রতিপাদ্য—‘No Forests, No Rivers, No Water, No Life’—বাংলায় ‘বন নেই, নদী নেই; পানি নেই, জীবন নেই।’ প্রতিপাদ্যটি বন, নদী, পানি ও জীবনের আন্তঃসম্পর্কের দিকে দৃষ্টি ফেরায়। নদীকে বিচ্ছিন্ন কোনো জলধারা হিসেবে নয়, বরং বন, জলাভূমি, খাল, প্লাবনভূমি, ভূগর্ভস্থ পানি ও সমুদ্রের সঙ্গে যুক্ত একটি বৃহত্তর পানিপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তাও এতে উঠে আসে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব নদী দিবসের শেকড় কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। নদী সংরক্ষণকর্মী মার্ক অ্যাঞ্জেলো ১৯৮০ সালে সেখানে ‘বিসি রিভারস ডে’ (BC Rivers Day) চালু করেন। নদী নিয়ে জনসম্পৃক্ততা তৈরির সেই উদ্যোগের সাফল্য থেকেই পরে বিশ্বব্যাপী নদী দিবস পালনের ধারণা তৈরি হয়।
২০০৫ সালে জাতিসংঘ ‘ওয়াটার ফর লাইফ ডেকাড’ (Water for Life Decade) শুরু করার পর মার্ক অ্যাঞ্জেলোর উদ্যোগে নদী দিবসকে বৈশ্বিক পর্যায়ে নেওয়ার প্রস্তাব সামনে আসে। ওয়ার্ল্ড রিভারস ডে-এর ইতিহাস অনুযায়ী, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা প্রস্তাবটিকে ওয়াটার ফর লাইফ ডেকাড-এর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখে এবং প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। ওই বছরই প্রথম বিশ্ব নদী দিবস পালিত হয়। এরপর থেকে সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
তবে বিশ্ব নদী দিবস জাতিসংঘ ঘোষিত কোনো আন্তর্জাতিক দিবস নয়। এটি নদী ও পানিসম্পদ সংরক্ষণে বৈশ্বিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ তৈরির একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশে নদী দিবসের তাৎপর্য
নদী-নির্ভর বাংলাদেশে বিশ্ব নদী দিবসের গুরুত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীবিকা, জলজ জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে নদ-নদীর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৫ সালের হালনাগাদ তালিকায় বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫টি। ২০২৬ সালের ২৫ জুন জাতীয় সংসদেও নৌপরিবহনমন্ত্রী এই সংখ্যা উল্লেখ করেন। একই বক্তব্যে দেশজুড়ে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদী দখলদার শনাক্ত হওয়ার তথ্যও জানানো হয়।
বাংলাদেশে ২০১০ সালে রিভারাইন পিপল-এর উদ্যোগে বিশ্ব নদী দিবস পালন শুরু হয়। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর তারা মার্ক অ্যাঞ্জেলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু দিবসটি কেবল আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। দেশের নদ-নদীর বর্তমান অবস্থা বরং প্রশ্ন তুলছে—নদীগুলোকে আমরা কতটা প্রবাহমান, দূষণমুক্ত ও পরিবেশগতভাবে কার্যকর রাখতে পারছি?

কেন সংকটে নদীপ্রবাহ?
বাংলাদেশের নদ-নদী নানা ধরনের মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক চাপের মুখে রয়েছে। কোথাও দূষণ, কোথাও দখল, কোথাও অতিরিক্ত পলি ও নাব্যতা সংকট; আবার কোথাও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পানি উত্তোলন বা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তনের কারণে সংকট বাড়ছে।
শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য ও প্লাস্টিক
অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ও কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিকও নদী দূষণের গুরুত্বপূর্ণ নতুন মাত্রা হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু বার্ষিক প্লাস্টিক ব্যবহার বেড়ে ৯ কেজিতে পৌঁছায়, যা ২০০৫ সালের তুলনায় তিন গুণ। অব্যবস্থাপিত প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি বড় অংশ নদী ও জলাশয়ে গিয়ে পড়ে।
ঢাকার বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Environmental Science: Advances) শুষ্ক মৌসুমে বুড়িগঙ্গার পানিতে প্রতি লিটারে ২৬.৯৮ থেকে ৩৭৪.৮৪টি এবং তুরাগে ৩.০২ থেকে ২৪.৭৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। এমনকি নদীর পলিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নিয়ে ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় (Regional Studies in Marine Science) গড়ে প্রতি লিটার পানিতে যথাক্রমে ১২.৪টি ও ১১.৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। গবেষণাটি দুই নদীর পানিকে ঝুঁকি-শ্রেণিবিন্যাসে যথাক্রমে চতুর্থ ও তৃতীয় শ্রেণিতে রেখেছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর পানি নিয়েও একই ধরনের উদ্বেগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় (Marine Pollution Bulletin) নদীর উপরিভাগের পানিতে প্রতি ঘনমিটারে ১৪.২৪–২৬.৬৮টি এবং তলানিতে প্রতি কেজিতে ৭৫.৬৩–২৭২.৪৫টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। গবেষণায় ফাইবার ও খণ্ডিত প্লাস্টিক এবং ০.৩–০.৫ মিলিমিটার আকারের কণার উপস্থিতি বেশি ছিল।
অর্থাৎ নদীর প্লাস্টিক দূষণ এখন শুধু দৃশ্যমান বোতল, প্যাকেট বা পলিথিনের সমস্যা নয়; এর একটি অংশ অতি ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে নদীর পানি ও পলিতেও জমা হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও পয়োবর্জ্য। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের একটি কর্মসূচির নথি অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ২০ শতাংশ বাসিন্দার পাইপযুক্ত পয়োনিষ্কাশন সংযোগ রয়েছে এবং ৮০ শতাংশের বেশি অপরিশোধিত বর্জ্যপানি ও পয়োনিষ্কাশনের পানি সরাসরি নগরের আন্তঃসংযুক্ত জলপথে গিয়ে পড়ে। একই নথিতে ঢাকার চারপাশের নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবসম্মত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দখলের চাপ
নদীর তীর, প্লাবনভূমি ও প্রবাহপথ দখল করে শিল্পকারখানা, আবাসন কিংবা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক পরিসর সংকুচিত করে।
২০২৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদে জানানো হয়, দেশের নদ-নদীর ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ দখলদার শনাক্ত করা হয়েছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হালনাগাদ তালিকা ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনগুলোকে তালিকা যাচাই ও উচ্ছেদ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখান সমস্যার সমাধান শুধু উচ্ছেদ নয়। দখলমুক্ত করা নদীতীর পুনরায় দখল হচ্ছে কি না, নদীর সীমানা যথাযথভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে কি না এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন
নদী থেকে বালু উত্তোলন সবক্ষেত্রে ক্ষতিকর—এমন সরল সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। তবে অতিরিক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন নদীর তলদেশ ও তীরের ভূ-আকৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
মেঘনা নদী নিয়ে ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় (Dhaka University Journal of Earth and Environmental Sciences) ব্যাপক বালু উত্তোলনের সঙ্গে নদীর তলদেশের গঠন ও ভূ-আকৃতিগত পরিবর্তনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় নদীতীর ক্ষয়ের বিষয়ও উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের আরেক গবেষণায় সোমেশ্বরী নদীতে ২০২০–২৩ সময়ে বালু উত্তোলনের প্রেক্ষাপটে নদীর আকৃতিগত পরিবর্তন, গভীর গর্ত এবং তীরভাঙনের প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে।
তাই বালু উত্তোলন বন্ধ বা চালু—এই দ্বিমাত্রিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে কোথায়, কতটা এবং কী পদ্ধতিতে উত্তোলন করা হচ্ছে, তার নদী-ভূ-আকৃতিগত প্রভাব মূল্যায়ন জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও নদী ও মিঠাপানির ব্যবস্থার ওপর পড়ছে। বৃষ্টিপাত ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার বিস্তার নদী ও মিঠাপানির ব্যবস্থাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং কমে যাওয়া মিঠাপানির প্রবাহ বঙ্গীয় বদ্বীপে লবণাক্ততার বিস্তার ও স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলীয় ৫৪টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের প্রায় দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ২০২৫ সালের এক গবেষণায় (Ecological Indicators) এ প্রবণতা চিহ্নিত করা হয়েছে।

নদীর পুনরুজ্জীবনে কী করা জরুরি?
একটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু নদীর পাড় পরিষ্কার বা এককালীন উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়। নদীর পুরো অববাহিকা, প্রবাহ, পলি, দূষণের উৎস এবং মানুষের ব্যবহার—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথমত, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) নির্মাণ করলেই হবে না; সেগুলো নিয়মিত চালু আছে কি না, নির্গত বর্জ্যের মান কেমন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশগত শর্ত মানছে কি না—তা নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে নগরের বর্জ্যপানি ও পয়োনিষ্কাশন সরাসরি নদী বা খালে পড়া বন্ধ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা প্রয়োজন। নদী ও নগর ড্রেনে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারিও জরুরি।
তৃতীয়ত, নদীর ভূ-সংস্থান ও প্রবাহপথ রক্ষা করতে হবে। দখল উচ্ছেদের পাশাপাশি নদীর সীমানা বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ, প্লাবনভূমি রক্ষা এবং উদ্ধার করা জমি পুনরায় দখল ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা দরকার।
চতুর্থত, ড্রেজিং হতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে কোথাও ড্রেজিং প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সব নদীতে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা সমাধান নয়। নদীর প্রবাহ, পলি পরিবহন, উজান-ভাটির সংযোগ ও পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ড্রেজিং ও পলি ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
পঞ্চমত, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ নদীর অবৈধ দখল, দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধারের জন্য কমিশনের আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
তবে কমিশনের কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখনও আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে জাতীয় সংসদে জানানো হয়, কমিশনের ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে নদী দখল ও দূষণকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা, পৃথক নদী আদালত গঠন, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায়ের ব্যবস্থা এবং নদী-সংক্রান্ত মামলা তদারকির মতো বিষয় রয়েছে।
ষষ্ঠত, আন্তঃসীমান্ত নদীর ক্ষেত্রে অববাহিকাভিত্তিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রবাহ সীমান্ত অতিক্রম করে আসে। ফলে পানি প্রবাহের তথ্য, বন্যা ও খরার পূর্বাভাস, পলি ব্যবস্থাপনা এবং পানির ব্যবহার নিয়ে তথ্য আদান-প্রদান ও সহযোগিতা নদী ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু নদী নয়, পুরো অববাহিকাকে বিবেচনায় নিতে হবে
নদীকে বাঁচাতে হলে শুধু মূল প্রবাহের দিকে তাকালে হবে না। একটি নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকে উজানের বন, পাহাড়, ঝরনা, খাল, বিল, হাওড়, প্লাবনভূমি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং শেষ পর্যন্ত মোহনা ও সমুদ্র।
তাই নদী পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও হওয়া উচিত অববাহিকাভিত্তিক। কোথা থেকে পানি আসছে, কোথায় পলি জমছে, কোথায় দূষণ ঢুকছে, কোথায় পানি আটকে যাচ্ছে এবং কোথায় নদীর সঙ্গে জলাভূমির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া টেকসই নদী ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২৩-২৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘Kollolini: A River Dialogue 2026’ অনুষ্ঠিত হয়। ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মূল সংলাপের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Knowing Our Rivers, Deciding Together’। এতে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষক ও নদী-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, নদী ব্যবস্থাপনায় নীতি, বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসে।
নদীকে শুধু একটি জলধারা নয়, একটি জীবন্ত ও আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা—এই দৃষ্টিভঙ্গিই নদী পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাকে প্রকল্পকেন্দ্রিকতা থেকে অববাহিকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনার দিকে নিতে পারে।
নদী বাঁচানোর দায়িত্ব কার?
নদী রক্ষার দায়িত্ব কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর নয়। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নগর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, কৃষক, জেলে, প্রকৌশলী, গবেষক এবং সাধারণ নাগরিক—সব পক্ষের কর্মকাণ্ড নদীর ওপর প্রভাব ফেলে।
তাই নদী পুনরুজ্জীবনের প্রশ্নে শুধু উচ্ছেদ অভিযান বা একটি প্রকল্পের সাফল্য দিয়ে অগ্রগতি মাপলে হবে না। দেখতে হবে নদীর প্রবাহ ফিরছে কি না, দূষণের উৎস কমছে কি না, জলজ প্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হচ্ছে কি না এবং স্থানীয় মানুষ নদীর সঙ্গে টেকসইভাবে যুক্ত হতে পারছে কি না।
বিশ্ব নদী দিবসের বার্তা তাই কেবল একটি দিনের সচেতনতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদীকে জীবন্ত জলপ্রবাহ ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা, তার অববাহিকা রক্ষা করা এবং দূষণ, দখল ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার চাপ কমানোই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি নদী পুনরুজ্জীবনের ভিত্তি।
তথ্যসূত্র:
● World Rivers Day — official history
● World Bank, Meeting Bangladesh's Plastic Challenge through a Multisectoral Approach (2021)
● World Bank, World Bank Helps Reduce Dhaka's Water Pollution (February 2026)
● Mahmud, F., Roy, H., Bhuiyan, M.M.K., & Islam, M.S. (2025). Critical analysis, characterization, and treatment of microplastics in the peripheral rivers of Dhaka city: Buriganga and Turag. Environ. Sci.: Adv., 4, 1810–1833. DOI: 10.1039/D5VA00118H
● Sadia, M.M. et al. (2025). Microplastics pollution and risk assessment in two urban rivers and an associated water treatment plant in Bangladesh. Regional Studies in Marine Science, 89, 104286. DOI: 10.1016/j.rsma.2025.104286
● Jui, M. et al. (2025). Microplastic pollution in the water and sediment of the Karnaphuli River, Bangladesh: An ecological risk assessment. Marine Pollution Bulletin, 216, 117948. DOI: 10.1016/j.marpolbul.2025.117948
● Joly, M.A.A., & Islam, M.S. (2024). Impact of Sand Mining on Bathymetry of the Meghna River. Dhaka University Journal of Earth and Environmental Sciences, 13(1), 21–28. DOI: 10.3329/dujees.v13i1.77557
● Feist, S.E., Hoque, M.A., Islam, M.A., Dewan, A., & Fowler, M. (2025). Sea-level rise drives changes in salinisation patterns in low-lying Bangladesh. Ecological Indicators, 176, 113543. DOI: 10.1016/j.ecolind.2025.113543
● Kollolini Programme highlights, AFD South Asia (LinkedIn)
● Riverine People; বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নদী তালিকা